পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এসব সম্পদ তিনি একাই ভোগ করছেন না। সূত্রের খবর, এদের মধ্যে ভাগ বরাদ্দ করা হয়েছে কয়েকজন প্রভাবশালী ও পলাতক পুলিশের কর্মকর্তার মধ্যে।
তালিকায় আছেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, পলাতক সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশিদ, পুলিশের বিশেষ শাখার সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম এবং অন্তত ১০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বিদেশে বসবাসরত এই কর্মকর্তারা মোজাম্মেলের অর্থ দিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। এছাড়া কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকেও অর্থ পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও সম্পদের পাহাড়:
দীর্ঘকাল গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার সুবাদে গাজী মোজাম্মেল বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নানা গণমাধ্যমে এর আগে তাঁর সম্পদের কথা উঠে এসেছে। তদন্তে জানা গেছে, সরকারি দায়িত্বের আড়ালে তিনি এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য তৈরি করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি জমি দখল, জোরপূর্বক ক্রয়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তার করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়েছেন।
রূপগঞ্জ, কুমিল্লার মেঘনা এবং সুনামগঞ্জের ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের জমি ও প্রকল্প দখল করা হয়েছে। রূপগঞ্জের হাজি সোলাইমান মিয়া জানান, “আমার মাছের প্রজেক্ট মোজাম্মেল দখল করেছে। আট বিঘা জমিসহ সব ভরাট করা হয়েছে। থানা ও হেডকোয়ার্টার্সে গিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। এখন শাক-সবজি বিক্রি করি, ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করছে। দখল না হলে আর্থিকভাবে ভালো থাকতাম।”
বিদেশে পাচার ও বিলাসী জীবন:
মোজাম্মেলের উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এই অর্থ ব্যবহার করে ঘনিষ্ঠজনদের বিদেশে বাড়ি, গাড়ি ও বিলাসী জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আলোচনায় বিশেষভাবে এসেছে বেনজীর পরিবারের নাম। এখানে শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, পলাতক পুলিশের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তারা ভারত, ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে দামি অ্যাপার্টমেন্ট, বিলাসবহুল গাড়ি এবং উচ্চমানের জীবনযাপন করছেন।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি প্রকল্পে বেনজীর আহমেদকে একটি প্লট উপহার দিয়েছেন মোজাম্মেল। সেখানে তিনি বাড়িও করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন ইতিমধ্যে সেই সম্পদ জব্দ করেছে।
উৎস অনুসারে, মোজাম্মেল শুধু ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য বেনজীরকে প্লট দিয়েছেন। প্রকল্পের নামের সঙ্গে ‘পুলিশ’ শব্দ থাকলেও সরকারি কোনো অনুমোদন বা সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, জমি অধিগ্রহণ জোরপূর্বক করা হয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পৈতৃক জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
সিন্ডিকেট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি:
মোজাম্মেল একা নন। তার সঙ্গে জড়িত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এই চক্র প্রশাসন, ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অর্থ সংগ্রহ, পাচার ও বিনিয়োগের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দুর্নীতি দমন ও সুশাসনের সঙ্গে এ ঘটনা সাংঘর্ষিক। তারা বলছেন, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন, না হলে জনগণের আস্থা কমে যাবে। অপরাধ বিশ্লেষক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, “এই কর্মকর্তাদের কোনো মনিটরিং নেই। তারা সব কাজ নামে-বেনামে করছেন। দুদকের ভূমিকা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মনিটরিং জরুরি।”
সুধীসমাজ এবং সচেতন নাগরিকরা দাবি করছেন, গাজী মোজাম্মেলের সম্পদের উৎস, বিদেশে অর্থপাচারের পথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা উচিত। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করে তা ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

