পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে যোগ দিয়েছিলেন কিন্তু দায়িত্বের আড়ালে তিনি দীর্ঘকাল নিজের সম্পদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। ক্ষমতার দাপট ও পদবির সুবিধা ব্যবহার করে জমি দখল, নদী ভরাট এবং শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের নকশা করেছেন সুপরিকল্পিতভাবে।
স্থানীয় সূত্র, নথিপত্র এবং বিভিন্ন অনুসন্ধান প্রকাশ করে যে, মোজাম্মেল হক প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাকে নিজের দখল ও লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গত বছর তিনি অতিরিক্ত ডিআইজি পদ থেকে অবসরে গেছেন। স্থানীয়রা তাঁকে সাবেক দুর্নীতিবাজ আইজিপি বেনজীর দ্বিতীয় সংস্করণ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
প্রায় ২৬ বছরের চাকরিজীবনে তিনি গড়ে তুলেছেন শত শত কোটি টাকার সম্পদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। রাজধানীর উপকণ্ঠ রূপগঞ্জে রয়েছে তিন হাজার বিঘা জমির আবাসন প্রকল্প। এর পাশাপাশি প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে বাগানবাড়ি আছে, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। বান্দরবানে রয়েছে ১৭৫ বিঘা জমি, যেখানে আতর চাষ করা হয়। রূপগঞ্জের জিন্দাপার্ক এলাকাসহ নারায়ণগঞ্জ সদর এলাকায় তাঁর ভায়রার নামে কয়েক বিঘা জমি রয়েছে।
ডেমরার সারুলিয়া টেংরা এলাকায় স্ত্রীর নামে ৩১ শতাংশ জমিতে ব্রিজ ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিকানা রয়েছে। কুমিল্লার মেঘনা নদীর তীরে রিসোর্ট এবং সুনামগঞ্জে অন্যান্য সম্পত্তি মিলিয়ে সম্পদের পরিধি বিস্ময়কর। জানা যায়, আনন্দ পুলিশ হাউজিং ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত আনন্দ প্রপার্টিজের একটি সিস্টার কনসার্ন হিসেবে পরিচালিত হতো।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিপুল সম্পদের সংবাদ প্রকাশের পর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তা আলাদা কোম্পানি হিসেবে রেজিস্ট্রার অব জয়েন স্টকে নিবন্ধিত হয়। অনুসন্ধান বলছে, কিভাবে একটি আবাসন প্রকল্প কেন্দ্র করে শত শত বিঘা জমির মালিকানা তৈরি হয়েছে এবং তার বড় অংশ স্ত্রীর নামে স্থানান্তরিত হয়েছে, তা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রূপগঞ্জে আনন্দ হাউজিং সোসাইটি ও পুলিশ আনন্দ হাউজিং আবাসনে সরেজমিনে গেলে গণমাধ্যমকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সিকিউরিটি গার্ডরা জানায়, মোজাম্মেলের নির্দেশনা রয়েছে, অপরিচিতরা ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর বা অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই আবাসনের কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে বিশাল বাগানবাড়ি লক্ষ্য করা যায়, যা চারপাশে প্রাচীর ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভেতরে গরুর খামারসহ সম্পত্তি তদারকি করছেন কয়েকজন কর্মচারী। বিভিন্ন পয়েন্টে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। অজানা ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তারা সতর্ক হয়ে ওঠেন, যা এই সম্পদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার প্রমাণ দিচ্ছে।
ক্ষমতার বৃদ্ধি ও সম্পদের সম্প্রসারণ
১৯৯৭ সালে ১৭তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী কমিশনার (এসি) হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন গাজী মো. মোজাম্মেল হক। দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছর তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের ‘ডেভেলপমেন্ট’ শাখায় কর্মরত ছিলেন। অতিরিক্ত ডিআইজি পদে ওঠার পরও তিনি সেই শাখায় কাজ করে যান।
ডেভেলপমেন্ট শাখার দায়িত্ব হলো পুলিশের জমি-সম্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদ দেখাশোনা করা। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য দেখায়, মোজাম্মেল হক এই দায়িত্বকে ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করেছেন।
প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় তাঁর পরিবারের মালিকানায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিঘা জমি রয়েছে। এর বড় অংশ কৌশলে তাঁর স্ত্রীর নামে নামান্তরিত করা হয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ত্রীর নামে সম্পত্তি স্থানান্তর করা একটি পরিচিত কৌশল, যা অনুসন্ধান বা তদন্তের সময় দায় এড়াতে ব্যবহৃত হয়।
পুলিশের ছাপযুক্ত আবাসনে রহস্য ও বিতর্ক
রূপগঞ্জে পূর্বাচলের পাশে গড়ে উঠেছে ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি’ নামে একটি বিশাল আবাসন প্রকল্প। প্রকল্পের নামেই ‘পুলিশ’ শব্দ থাকার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি সরকারি বা পুলিশ-সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধান বলছে, এর নামে কোনো বৈধ সমবায় সমিতির অস্তিত্ব নেই, পুলিশ সদর দপ্তরের সঙ্গেও কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। প্রকল্পটি মূলত একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ।
এই আবাসন প্রকল্পের আওতায় প্রায় তিন হাজার বিঘা জমি প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে। বর্তমানে এর নাম কেবল ‘আনন্দ হাউজিং’। এদিকে গাজী মোজাম্মেলের স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের নামে রয়েছে ‘আনন্দ প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান। ফারজানার নামে রূপগঞ্জের বিভিন্ন মৌজায় বিস্তর জমি রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ছয় হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি ২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করে। গাজী মোজাম্মেল ২০০৬ সাল থেকে রূপগঞ্জে জমি কেনা শুরু করেন। পরের বছর পুলিশের কিছু অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠন করেন ‘আনন্দ পুলিশ পরিবার কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি’। এরপর আবাসন ব্যবসা শুরু হয় ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি’ নামে। একাধিক সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘পুলিশ’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে ব্যবসায়িক সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে।
গাজী মোজাম্মেলের স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেল কাগজপত্রে আনন্দ প্রপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কোম্পানিটি ২০১৩ সালের ১৬ জুন নিবন্ধিত হয়। নথিপত্র অনুযায়ী, কোম্পানির ১৫ হাজার শেয়ারের মধ্যে সাড়ে ১৩ হাজার শেয়ারের মালিকানা ফারজানার নামে, যা মোট শেয়ারের ৯০ শতাংশ। বাকি দেড় হাজার শেয়ার অন্যান্য দুই কর্মচারীর নামে রয়েছে।
এছাড়া দাউদপুর ইউনিয়নের ওলপ গ্রামে ৩০ বিঘা জমি রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা। সদর ইউনিয়নের গুতিয়াবো মৌজায় সরকারি সম্পত্তি দখল করে ৮৩ শতাংশ জমিতে বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সুনামগঞ্জের হাসাউড়ায় ১০ কোটি টাকার প্রায় ১০০ বিঘা জমি রয়েছে। বর্তমানে আরও জমি কেনার প্রক্রিয়া চলছে।
জমি দখলে ভয় ও অনিয়মের ছায়া
রূপগঞ্জে মোজাম্মেল হকের জমি ক্রয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে গুরত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠে এসেছে। অনেককে জোরপূর্বক জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছে। বাজারমূল্যের তুলনায় নামমাত্র দামে জমি নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হুমকি, মামলা ও ভয় দেখিয়ে তাঁরা বাধ্য হয়েছেন জমি ছাড়তে। কেউ কেউ রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে জমি লিখে দিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
রূপগঞ্জের আবাসন প্রকল্পের জন্য জোরপূর্বক জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন ভুক্তভোগী জানালেন, প্রতিবাদ করায় তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে, চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে।
একাধিক অভিযোগে উল্লেখ আছে, ২০১৭ সালের জুলাই মাসে রূপগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধ জাহের আলীকে টানা ১৩ দিন ডিবি অফিসে আটকে রেখে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছিল। জাহের আলীর ব্যক্তিমালিকানাধীন মোট ৬২ বিঘা জমি মোজাম্মেলের নামে লিখে দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি নির্মম নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে শেষ পর্যন্ত জমি মোজাম্মেলের নামে লিখে দেন।
ঘটনাটি তখন গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচিত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এই ঘটনার সঙ্গে অবগত হন। জাহের আলীর পুত্রবধূ আফরোজা আক্তার আঁখি বাদী হয়ে মোজাম্মেল, তাঁর স্ত্রী ফারজানাসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন। তবুও, তাদের সম্পদ এখনো পুরোপুরি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
অবৈধ সম্পদ স্ত্রীর নামে সুরক্ষার পরিকল্পনা:
মোজাম্মেলের অবৈধভাবে গড়া সম্পদের বড় অংশই রয়েছে তাঁর স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের নামে। ‘আনন্দ প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানির মাধ্যমে এই সম্পদ আংশিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। নথি অনুযায়ী, কোম্পানির ৯০ শতাংশ শেয়ার ফারজানার নামে। অন্য শেয়ারহোল্ডারদের প্রকৃত ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কম্পানির ঘোষিত সম্পদের চেয়ে বাস্তব সম্পদের পরিমাণ বহুগুণ বেশি। এছাড়া ঢাকার ডেমরায় ফারজানা মোজাম্মেলের নামে রয়েছে পশুপাখির ওষুধ উৎপাদনকারী ব্রিজ ফার্মাসিউটিক্যালস।
আবাসন প্রকল্পের জমি কেনাবেচায় অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক নিজেই প্রকাশ্যে উপস্থিত থাকেন। প্রকল্পের পরিচালক হিসাবেও নথিতে তাঁর স্বাক্ষর আছে। প্রকল্পের কর্মচারী ও কর্মকর্তারাও কালের কণ্ঠের কাছে স্বীকার করেছেন, প্রকৃত মালিক মোজাম্মেল হক। তবে আইনের ফাঁকফোকর এড়াতে কৌশলে সম্পদের বড় অংশ স্ত্রীর নামে স্থানান্তর করেছেন।
স্ত্রীর নামে বিস্তৃত সম্পদ: মেঘনা রিসোর্ট ও বাগানবাড়ি:
অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল হকের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার বড়কান্দা ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামে। সেখানে স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের নামে গড়ে তোলা হয়েছে অঢেল সম্পদ। ২০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত রয়েছে বিশাল বাগানবাড়ি ও মৎস্য খামার, যা ‘মেঘনা রিসোর্ট’ নামে পরিচিত। এই প্রকল্পের একটি বিশেষ দিক হলো—নদীর ভেতরে বালু ফেলে কৃত্রিম চর তৈরি করা হয়েছে।
শুধু রিসোর্টই নয়, হরিপুরে ফারজানার নামে চারতলা ভবনের সুরম্য অট্টালিকা তৈরি করেছেন মোজাম্মেল। এই বাড়ি থেকে রিসোর্টে যেতে হয় ট্রলারে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতে বালু ফেলার ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, সাধারণ মানুষের নদীতে প্রবেশ সীমিত হয়ে গেছে এবং পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও আইনি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় সূত্র বলছে, ক্ষমতাসীন সরকারের পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে মোজাম্মেল প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী প্রবাসী সেন্টু মিয়া জানিয়েছেন, তাঁদের প্রায় ১২০ শতাংশ ফসলি জমি জোরপূর্বক বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। আগে এখানে ধান, তরমুজ, খিরাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ হতো। বর্তমানে ভয়ে তারা মুখ খুলতে পারছেন না এবং সমস্যার সমাধানও পাচ্ছেন না। এছাড়া বিভিন্ন জেলার লোকজনের মাধ্যমে এই সম্পদ পরিচালনা করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নদী খননের (ড্রেজিং) নামে মেঘনা নদী থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ বালুর একটি অংশ নিজের পুকুরে ভরাট করা হয়েছে, বাকি অংশ বিক্রি করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কোনো সুবিধা হয়েছে না।
সূত্র আরও জানায়, গাজী মোজাম্মেল হক বর্তমানে চাকরি থেকে অবসরে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা চলমান রয়েছে। তবুও ভুক্তভোগীরা দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখছেন না। সর্বশেষ ১৪ মার্চ নিজ গ্রামে একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁকে উপস্থিত দেখা গেছে।
খোঁজে জানা গেছে, নিজ এলাকার বাইরেও মোজাম্মেল সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন, তবে প্রায় সবখানেই মালিকানা স্ত্রীর নামে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রঙ্গার চর ইউনিয়নের হাসাউড়া গ্রামে তাদের বাগানবাড়ি গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর, যার মূল্য কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, এই বাগানবাড়ির জন্য জমি ক্রয় এবং দখল ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। মোজাম্মেলের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন ম্যানেজার সিদ্দিক মিয়া, যার মাধ্যমে সব কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
অবৈধ সম্পদের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলমান :
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান অনুযায়ী, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক এবং তাঁর স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, তাঁদের নামে থাকা সম্পদের উৎস প্রশ্নবিদ্ধ।
গাজী মোজাম্মেলের নামে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট ২২ কোটি ৯৬ লাখ ৪১ হাজার ৯৭৫ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে পারিবারিক ও অন্যান্য খাতে তাঁর ব্যয় হয়েছে চার কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ৪০৭ টাকা। ফলে মোট সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার ৩৮২ টাকা। বৈধ আয়ের পরিমাণ পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৮০ লাখ ১৮ হাজার ৩১৩ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৯৪ হাজার ৬৯ টাকা, যা প্রাথমিকভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের ইঙ্গিত দেয়।
ফারজানা মোজাম্মেলের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নামে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট পাঁচ কোটি ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকার সম্পদ রয়েছে। একই সময়ে পারিবারিক ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে দুই কোটি ৭৩ লাখ ১৫ হাজার ৮৬২ টাকা। বৈধ আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৫ টাকা।
দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বামী-স্ত্রীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান। দুদক তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দিয়েছে। প্রাপ্ত বিবরণী যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে, গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি আদালত মোজাম্মেল হকের নামে থাকা ৬৫ বিঘা জমি জব্দের আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ফারজানা এবং সন্তান গাজী বুশরা তাবাসসুমের নামে থাকা কয়েকটি জমি ও ২৮টি ব্যাংক হিসাবও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত এই আদেশ দেন। মোজাম্মেল হক মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তা ধরেননি।
ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেছেন, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার অন্য সদস্যদের আরও বেপরোয়া করে তুলবে। নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেছেন, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যাঁদের দায়িত্ব অপরাধ প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, অনেকেই নিজস্ব ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতি সত্ত্বেও বিচার অনেক সময় দূরে থাকে। রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক, ব্যবসা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবের কারণে তারা সুবিধাভোগী ও সুরক্ষিত থাকে। সূত্র: কালের কন্ঠ

