আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মানবসেবার মিশ্রণে পরিচালিত হওয়া দেওয়ানবাগ দরবার শরিফের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। রাজধানীর মতিঝিলের আরামবাগে ‘বাবে রহমত’ নামের প্রধান কার্যালয় থেকে পরিচালিত এই দরবারকে ঘিরে রয়েছে বিতর্ক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেওয়ানবাগ দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের হাতে রয়েছে হাজার কোটি টাকার অদৃশ্য সম্পদের জাল। দেশের রাজধানীসহ অন্তত ৩০ জেলায় বিস্তৃত রয়েছে জমি, ডজনখানেক ভবন, এবং বিদেশেও আছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
দরবারের নামকে আড়াল করে পরিচালিত হচ্ছিল অসংখ্য আর্থিক লেনদেন। ব্যাংক ও বিভিন্ন নথিতে পাওয়া গেছে ভুয়া বা কার্যক্রমহীন কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ। পীরের তিন সন্তানের ব্যাংক হিসাব অনুসন্ধান করলে প্রমাণ মিলেছে প্রায় ৩৬৭ কোটি টাকার লেনদেনের। এর মধ্যে এক সন্তানের ২৪টি ব্যাংক হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) জব্দ করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দরবারের অধিকাংশ সম্পদই অপ্রকাশিত। জমি দখল ও সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে স্থানীয়দের ওপর প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। যদিও দরবার আত্মশুদ্ধি, নৈতিক সংস্কার ও মানবসেবাকে প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে প্রচার করে, তবু অনুসন্ধান দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। সব তথ্য একত্র করলে ফুটে ওঠে প্রশাসনিক নীরবতার জটিল চিত্র। দরবারের আড়ালে থাকা এই বিপুল সম্পদ ও বিতর্ক এখনো দেশের সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক ক্ষেত্রে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
দলিলপত্র, ব্যাংক নথি, সম্পত্তির রেকর্ড এবং সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেওয়ানবাগ দরবার শরিফের চারপাশে গড়ে ওঠা সম্পদের পরিধি বহুস্তরীয়। রাজধানী ঢাকার মতিঝিল, মগবাজার, মেরাদিয়া, বেগুনবাড়ি, জুরাইন, মিরপুর, দক্ষিণখানসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক ভবন ও উল্লেখযোগ্য জমি।
দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে খানকা, দরবার কমপ্লেক্স এবং ব্যক্তিগত মালিকানার জমি। নথি অনুযায়ী, এসব সম্পদের বড় অংশ প্রতিষ্ঠাতা পীরের মৃত্যুর পর তার সন্তানদের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে। যদিও সূত্র বলছে, এসব অর্থের মূল উৎস ভক্তদের দান, কিন্তু দানের টাকায় সম্পদ সৃষ্টির ব্যাপারটি সন্তানদের নামে হয়েছে। সম্পদের একটি অংশের উৎস ও ক্রয়ের অর্থ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ব্যবসায়িক তথ্য পাওয়া যায়নি।
অর্থনৈতিক নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিবারের কয়েকজন সদস্যের ব্যাংক হিসাবগুলোতে কয়েক বছরে শতকোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এর একটি অংশ বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে, কিন্তু অনেক কোম্পানির দৃশ্যমান ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা কার্যকর অফিসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট এসব হিসাবকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং কিছু ব্যাংক হিসাবের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। বিদেশে নিবন্ধিত কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঢাকাকেন্দ্রিক এই সাম্রাজ্য মূলত রাজধানীর মতিঝিলের কেন্দ্রীয় দরবারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। সেখানে রয়েছে অর্ধ ডজন ভবন ও কমপ্লেক্স। পুরানা পল্টন, মগবাজার, আরামবাগ, ফকিরাপুল, দক্ষিণ কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ‘বাবে কুতুবুল আকতার’, ‘বাবে রহমত কমপ্লেক্স’, ‘বাবে রিয়াজুল জান্নাত’ ও ‘বাবে সালাম’ নামে ভবন ও স্থাপনা রয়েছে। এছাড়া মেরাদিয়া, বেগুনবাড়ি, জুরাইন, মিরপুর, আমিনবাজার ও রাজারবাগেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও স্থাপনা আছে।
ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, রংপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে খানকা, জমি ও স্থাপনার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। নথি অনুযায়ী অন্তত ৩০টি জেলায় সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, তবে সূত্র জানায়, প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নথিভুক্ত তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
দেওয়ানবাগ পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কিছু সূত্র জানায়, ভক্তরা সাধারণত কমপ্লেক্সের ভেতরে প্রয়াত পীরের কবর পর্যন্ত যেতে পারেন। মূল ভবনে প্রবেশ সীমিত, বিশেষ অনুমতি ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না। ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কয়েক দফা তল্লাশির পরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। কমপ্লেক্সে নানা ধরনের পশু পালন করা হয়, মরুভূমির প্রাণী উটের খামার আছে এবং কয়েকটি দামি গাড়ি রাখা হয়। প্রয়াত পীরের প্রত্যেক সন্তানকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় দেওয়ানবাগীর সন্তানদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। অন্তত এক ডজন বাড়ি এবং হাজার কোটি টাকার জমির প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেশের সাতটি মহানগর এলাকা এবং ৩০ জেলায় ছড়িয়ে আছে তাদের অন্যান্য সম্পদ। সব মিলিয়ে দেওয়ানবাগ পরিবারের আর্থিক সাম্রাজ্য অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে। দেওয়ানবাগ শরিফের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার সাত সন্তান রয়েছেন। মৃত্যুর পর সব সম্পদ সাত সন্তানের নামে হস্তান্তর করা হয়। সন্তানরা হলেন:
- সৈয়দ এ এফ এম নূর-এ-খোদা
- সৈয়দ এ এফ এম কুদরত-এ-খোদা
- সৈয়দ এ এফ এম ফজল-এ-খোদা
- সৈয়দ এ এফ এম মঞ্জুর-এ-খোদা
- সৈয়দা তাহমিনা সুলতানা
- তাকলিমা সুলতানা
- তাছলিমা সুলতানা-এ-খোদা
সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সম্পদ ও ব্যাংকের জমা অর্থ এই সন্তানদের মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা পীর জীবিত থাকাকালীন প্রধানভাবে তিনি দরবার পরিচালনা করতেন। মৃত্যুর পর সবাই নিজেদের পীর দাবি করে দরবার পরিচালনা করছেন।
দেওয়ানবাগের কেন্দ্রীয় দরবার রাজধানীর মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে অবস্থিত। এখানে প্রায় ১৯৩ শতাংশ জমি আছে, যার মধ্যে কিছু জমি দখল করা। এছাড়া কয়েকটি ভবনও রয়েছে। জমিগুলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর নোটিশে থাকে। গত পাঁচ বছরে অন্তত সাত–আটবার রাজউক এসব জমি থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নোটিশ দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো উচ্ছেদ অভিযান হয়নি।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তারা শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযানে যাবেন। এর আগে বহুবার নোটিশ দেওয়া হলেও দেওয়ানবাগ কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় জমি ছেড়ে যায়নি।
নথি অনুযায়ী, পুরানা পল্টন লাইন মৌজায় রয়েছে ৩২.৬৩ শতাংশ জমি, যেখানে ‘বাবে কুতুবুল আকতার’, ‘বাবে রহমত কমপ্লেক্স’, ‘বাবে রিয়াজুল জান্নাত’ ও ‘বাবে সালাম’ ভবন রয়েছে। বড় মগবাজার মৌজায় আছে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি, যার মধ্যে ২২ হাজার বর্গফুটের দুটি ফ্লোর দেওয়ানবাগীর সন্তানদের মালিকানায়। ঢাকার অন্যান্য এলাকায় রয়েছে আরও ৭৩৮.৩৮ শতাংশ জমি। মেরাদিয়া, বেগুনবাড়ি, দক্ষিণখান, আমিনবাজারের বিলামালিয়া, মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা, জুরাইন, জলাবাড়ি, আমুলিয়া ও রাজারবাগে বিস্তৃত রয়েছে এই সম্পদ। এসব জমিতে বিভিন্ন ভবন, মার্কেট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
রাজধানীর বাইরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় ১,৬১৩ শতাংশ জমি রয়েছে, যেখানে বৃহৎ খানকা ও ব্যবসাকেন্দ্র রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ৬৮.৫০ শতাংশ, ময়মনসিংহের ত্রিশালে ১,৩২০.৫৫ শতাংশ, রংপুরের পীরগাছায় ৪২৫ শতাংশ, চুয়াডাঙ্গায় ১০ শতাংশ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ১২ শতাংশ, গাজীপুরের জয়দেবপুরে ১০ শতাংশ এবং রাজশাহীর শাহমখদুমে ৪.১৩ শতাংশ জমি রয়েছে।
তাছাড়া নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ১৭.৬৪ শতাংশ, গাজীপুর মহানগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ৫২.৫৬ শতাংশ, মুন্সীগঞ্জে ৬৪.১৮ শতাংশ, নরসিংদীতে ৩১ শতাংশ এবং শরীয়তপুরে ২০ শতাংশ জমি আছে। কুমিল্লা মহানগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬১.৫০ শতাংশ, চাঁদপুরে ৬০ শতাংশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যান্য উপজেলায় ৯ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ২২ শতাংশ, কিশোরগঞ্জে ৫ শতাংশ, নেত্রকোনা ৫১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৬৭ শতাংশ, শেরপুরে ৫ শতাংশ, টাঙ্গাইলে ২৩ শতাংশ, পাবনায় ৮ শতাংশ, সিরাজগঞ্জে ১০ শতাংশ, বগুড়ায় ৫ শতাংশ, রংপুরে ৭০ শতাংশ, গাইবান্ধায় ৩৯ শতাংশ, পঞ্চগড়ে ৫০ শতাংশ, জয়পুরহাটে ৫ শতাংশ, রাজশাহীতে ৮.২৫ শতাংশ, লালমনিরহাটে ১০ শতাংশ, নাটোরে ১.৭৫ শতাংশ, যশোরে ১১.৫০ শতাংশ, নীলফামারীতে ২ শতাংশ, পিরোজপুরে ২৫ শতাংশ এবং পটুয়াখালীতে ৭ শতাংশ জমি রয়েছে।
যদিও এসব নথি পাওয়া গেছে, সূত্র জানায়, নামে-বেনামে দেওয়ানবাগীর সন্তানদের নামে আরও বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ রয়েছে, যার প্রকৃত পরিধি এখনও সম্পূর্ণভাবে জানা সম্ভব হয়নি।
দেওয়ানবাগ শরিফের রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর সময় দেখা গেছে, দক্ষিণ কমলাপুরে ‘বাবে মদিনা কমপ্লেক্স’, ফকিরাপুলে ‘বাবে রহমত দরবার কমপ্লেক্স’, দক্ষিণ কমলাপুরে ‘বাবে মাহদী’ এবং মগবাজারে ‘বাবে ফেরদৌস’ নামে ভবন রয়েছে। রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় আরও অন্তত ৮–১০টি ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও নিজস্ব সূত্রে এসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হলেও সকল ভবনের নথি সংগ্রহ করা যায়নি।
নথি অনুযায়ী, লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল ১১৭ ঠিকানায় ২০২১ সালে ‘দেওয়ানবাগ শরিফ লিমিটেড’ নামে তিন তলা বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান চালু হয়। কোম্পানির মালিক কুদরত-এ-খোদা। প্রতিষ্ঠানটিতে মোহাম্মদ মহিউদ্দীন খান নামে একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরিচালক রয়েছেন। মহিউদ্দীন খানের আরও কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইংল্যান্ডে রয়েছে, তবে সেগুলোর মালিকানা কুদরত-এ-খোদার কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যুক্তরাজ্যে কুদরত-এ-খোদার নাম অনুসারে আরও একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে—‘ওয়ার্ল্ড আশেক-এ-রাসুল অর্গানাইজেশন, ইউকে’। ২০১২ সালে চালু হওয়া এই প্রতিষ্ঠান ১০১৫-এ স্টক পোর্ট রোডের ঠিকানা ব্যবহার করেছে। এখানে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ লেনদেন দেখা গেছে। এছাড়া হোয়াইটচ্যাপেল ১১৭ ঠিকানায় ‘স্মল বিজনেস অ্যাকাউন্টিং সল্যুশন লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানও নিবন্ধিত আছে, মালিক মোহাম্মদ মহিউদ্দীন খান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য দেশে থেকে অর্থ পাচার হয়েছে। কুদরত-এ-খোদার নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের ১২টি অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে ৭৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৭৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
দেশে কুদরত-এ-খোদার নামে তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে—সিস্টেক ইউনিম্যাক্স লিমিটেড, আইন্যাক্স লিমিটেড ও টিকেট চাই লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অফিস বা দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে, যা পুরোপুরি উত্তোলন করা হয়েছে।
শুধু কুদরত-এ-খোদা নয়, তার দুই ভাই এ এফ এম মঞ্জুর-এ-খোদা ও এ এফ এম ফজল-এ-খোদার নামে তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে, যা পরবর্তীতে তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে তিন ভাইয়ের নামে পরিচালিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট ৩৬৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।
বিগত বছরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কুদরত-এ-খোদার নামে পরিচালিত ২৪টি সঞ্চয়ী, চলতি ও স্থায়ী আমানত হিসাবের লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) কর্তৃক স্থগিত করা হয়েছে। বর্তমানে এসব হিসাবের মধ্যে ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা রয়েছে। এসব লেনদেনের তথ্য ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে।
মতিঝিলে স্থানীয় মো. আব্দুল গফুরের জমি দখল করে দেওয়ানবাগ শরিফ উটের খামার তৈরি করেছে। এই জমির দাগ নং ৮৪১, ৮৪৩ এবং খতিয়ান নং ৬৪। জমি দখলের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গফুরের পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। অভিযোগ আছে, বিভিন্ন সময়ে তারা হামলার শিকার হয়েছেন।
মৃত গফুরের ছেলে মাইদুল ইসলাম মিন্টু জানান, ১৯৮৫ সালে তার বাবা-মা তিনটি দলিলের মাধ্যমে মতিঝিলের উত্তর ব্রাহ্মণচিরণ মৌজায় ৮০.৫০ শতাংশ জমি কিনেছিলেন। তখন থেকে পরিবারটি নিয়মিত জমির দখলে ছিল। পরবর্তী সময়ে আশপাশের কিছু জমি বিক্রি করা হয় এবং সরকার রাস্তা নির্মাণের জন্য ১১.৬০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করে। বাবদ ক্ষতিপূরণের চেকও দেওয়া হয়েছিল। সিটি জরিপে ৪৮.৩২ শতাংশ জমি রেকর্ডভুক্ত হয় এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করা হয়।
মিন্টুর অভিযোগ, পরবর্তীতে দেওয়ানবাগের লোকজন জাল দলিল তৈরি ও যোগসাজশের মাধ্যমে, সহায়তা পেয়েই বিগত সরকারের প্রভাবশালী আমলাদের সাহায্যে পুরো জমি দখল করে নেয়। একই সঙ্গে তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়। আদালতের স্ট্যাটাস কো থাকলেও তারা নিজের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া গোলাম কিবরিয়া শাজাহানের ১০ শতাংশের বেশি জমিও দেওয়ানবাগ দখল করেছে। বহু বছর ধরে মামলা চললেও জমি এখনও তাদের দখলে রয়েছে। গোলাম কিবরিয়ার মৃত্যুর পর তার সন্তানরা দেশ ছাড়েন।
শরীয়তুল্লাহ বিপ্লব নামে এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, ‘অপকর্মের’ বিষয়ে সব তথ্য জানার পর এবং পাওনা অর্থ চাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। নিজেকে দেওয়ানবাগ শরিফের মুরিদ সন্তান দাবি করলেও তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তার অভিযোগ, তাকে এবং তার স্ত্রীকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। নিরাপত্তার আশ্বাস পেতে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ কুদরত-এ-খোদা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ৫ কাঠা জমির একটি প্লট কিনেছেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এক কাঠা জমির হস্তান্তর ফি ১০ লাখ টাকা, তাই পাঁচ কাঠা জমির হস্তান্তর ফি দাঁড়ায় ৫০ লাখ টাকায়। তবে প্রকৃত ক্রয়মূল্য স্পষ্ট নয়। একইভাবে এল ব্লক (২৪৯০/এইচ) এলাকায় ৫ কাঠার আরেকটি প্লটও কিনেছেন, কিন্তু তার দামও নিশ্চিত নয়। জমি হস্তান্তর ও চুক্তিপত্র সংক্রান্ত সমস্ত কাজ করেছেন কাজী সালাহউদ্দীন।
এর বাইরে মানিকদির ২৫২ নম্বর জায়গায় ট্রিনিটি কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। ওই সাত কাঠা জমিতে সাততলা ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে, যার মধ্যে দ্বিতীয় তলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে জমি ক্রয়ের মূল্যের তথ্য পাওয়া যায়নি।
নথি অনুযায়ী, সিস্টেক ইউনিম্যাক্স, আইনেক্স আইডিয়া এবং গৃহ ঘড়ি নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট থেকে কুদরত-এ-খোদার অ্যাকাউন্টে ২ কোটি টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি; ওয়েবসাইট বা ঠিকানাও পাওয়া যায়নি। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বেশ কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) জানিয়েছে, কুদরত-এ-খোদার ব্যক্তি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নগদ অর্থ জমা হয়েছে, যা ১৫ কোটি টাকার বেশি। এই অর্থ দেওয়ানবাগ শরিফ এবং ভক্তদের দানের মাধ্যমে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নগদ জমা ছাড়া, এসব অ্যাকাউন্টে ইএফটি বা ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে আরও বিপুল অর্থ এসেছে। তবে এসব অর্থ ধর্মীয় কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অর্থ ব্যবহার হয়েছে এফডিআর, জমি ক্রয় ও আবাসিক ভবন নির্মাণে।
দেওয়ানবাগ পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার জামাতা সাইদুর রহমান মাহবুবী মিরপুর এলাকায় একটি বহুতল ভবন ভাড়া নিয়ে গড়ে তুলেছেন খানকাহ শরিফ। নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল আশেকে রাসুল অর্গানাইজেশন’। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে মৃত্যুর পর সরাসরি জান্নাতে পৌঁছানোর আশ্বাস দিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। শুধু সম্পদের মালিকই নন, সামাজিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি প্রভাবশালী বলয়। স্থানীয়রা জানান, তার কর্মকাণ্ডে মিরপুরের অনেক মানুষ অতিষ্ঠ।
দেওয়ানবাগ শরিফ সংশ্লিষ্ট আরেকটি অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, সাইদুর রহমান মাহবুবী নামে এক কথিত পীরকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাড়ি দখলের উদ্দেশ্যে জিয়াউদ্দিন রিপন নামে এক ব্যক্তিকে জুলাইয়ের একটি হামলার মামলায় আসামি করে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় তিন মাস কারাভোগের পর তার পরিবার চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। রিপনের স্ত্রী শারমিন জাহান বলেন, তাদের তিন বছরের সন্তান এখনও জানে না তার বাবা কারাগারে। পরিবারের দাবি, বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও তারা কোনো প্রতিকার পাননি।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, রিপনের সঙ্গে মাহবুবীর দুটি ফ্ল্যাট বিক্রির চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও পুরো টাকা পরিশোধ না করেই ফ্ল্যাট দুটি দখলে নেওয়া হয়। পরে পাওনা টাকা চাইলে শুরু হয় চাপ ও হুমকি। একপর্যায়ে তারা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে না চাইলে পুরো ভবন দখলের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ আছে, কয়েক দফা হামলার ঘটনাও ঘটে। পরিবারটির দাবি, পরে রিপনের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় তাকে একটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি প্রায় তিন মাস কারাভোগ করেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে সম্প্রতি মিরপুরে সংশ্লিষ্ট পীরের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। গেটের নিরাপত্তাকর্মী প্রতিবেদকের নাম-ঠিকানা রেজিস্টারে নথিভুক্ত করেন এবং ছবি সংগ্রহ করেন। পরে যোগাযোগের আশ্বাস দেওয়া হলেও আর কোনো সাড়া মেলেনি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সৈয়দ এ এফ এম মঞ্জুর-এ-খোদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কথা বলার আশ্বাস দেন। এরপর তার বিশেষ সহকারী পরিচয়ে একজন ফোনে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চান। লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও সেখান থেকেও আর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে সৈয়দ এ এফ এম কুদরত-এ-খোদা জানান, তাদের মিডিয়া উইং এ বিষয়ে কথা বলবে। পরে দেওয়ানবাগ শরিফের মুখপাত্র তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের লিখিত বক্তব্যে বলেন, দেওয়ানবাগ শরিফ একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ভক্তদের দানের টাকায় সম্পদ গড়া হয়েছে—এমন অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠাতার সন্তানরা পৈতৃক সূত্রেই সম্পদের মালিক হয়েছেন। বসুন্ধরার প্লট ক্রয়ের ক্ষেত্রেও পৈতৃক অর্থ এবং জমি অধিগ্রহণ বাবদ পাওয়া অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মানিকদিতে কুদরত-এ-খোদার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘গৃহগড়ি’ ডেভেলপার হিসেবে ভবন নির্মাণ করছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) জব্দ করা অ্যাকাউন্টগুলোর বিষয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তিন ভাইয়ের ব্যাংক লেনদেন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো দীর্ঘ সময়ের ডেবিট ও ক্রেডিট মিলিয়ে সামগ্রিক লেনদেনের হিসাব, যা বর্তমানে বিচারাধীন।
দেওয়ানবাগ শরিফের মুখপাত্র তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের জানিয়েছেন, সিসটেক ইউনিম্যাক্স, টিকেট চাই এবং ইনেক্স আইডিয়া—এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকলেও অতীতে সেগুলোতে ব্যবসা চলমান ছিল। তার ভাষ্য, কুদরত-এ-খোদা ধর্মীয় দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়া এবং বিদেশে অবস্থানের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বিদেশে ব্যবসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের হোয়াইটচ্যাপেলে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশটির আইন মেনেই চলছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে অর্থের উৎসও সংযুক্ত রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
জমি দখলের অভিযোগ সম্পর্কে জোবায়ের বলেন, মতিঝিলে রাজউকের জমি দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। তার দাবি, রাজউকের দেওয়া প্রতিটি নোটিশের বিপরীতে দেওয়ানবাগ শরিফ উচ্চ আদালত থেকে নিজেদের পক্ষে রায় পেয়েছে। শাহজাহান ও গফুরের জমি নিয়ে যে বিরোধ রয়েছে, সেটিও বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
তিনি আরও বলেন, সারা দেশে থাকা জমিগুলোতে দরবার, খানকা ও জাকের মজলিস পরিচালিত হয় এবং এসব ধর্মীয় স্থাপনা কোনো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হয় না।
দেওয়ানবাগ পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার জামাতা সাইদুর রহমান মাহবুবীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে জোবায়ের জানান, বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে জীবদ্দশাতেই সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা তার মেয়ে তাহমিনা এবং জামাতা সাইদুর রহমানকে দরবার শরিফ থেকে বের করে দেন এবং সামাজিকভাবে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন। সূত্র: কালবেলা

