একই সম্পত্তি বারবার মর্টগেজ দেখানো, ভুয়া ও অতিমূল্যায়িত জামানত ব্যবহার এবং কাগুজে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে সংঘটিত হয়েছে বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতি। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবাই মিলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও শফিক বিন আব্দুল্লাহর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গত এক দশকে ধাপে ধাপে ঋণের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঋণের নামে অন্তত ২৭ কোটি ১৯ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে। এ ঘটনায় সাতটি মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৬৬ জনকে আসামি করা হলেও ব্যক্তি হিসেবে সংখ্যা ৩৪ জন। প্রায় সব মামলাতেই শফিক বিন আব্দুল্লাহ, বেঙ্গল এক্সপ্রেসের মালিক আবুল খায়ের এবং তার পরিবারের সদস্যদের নাম উঠে এসেছে।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানান, মামলাগুলো আগের কমিশনের সময় অনুমোদিত হয়ে থাকতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়েরের বিষয়টি যাচাই করে জানানো হবে। এজাহার দায়ের হলে গণমাধ্যমকে অবহিত করা হবে।
সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে বৈধ জামানত ছাড়াই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সম্পত্তি একাধিকবার বন্ধক দেখানো হয়েছে। কোথাও ভুয়া কিংবা অতিমূল্যায়িত সম্পত্তি মর্টগেজ দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব উপায়ে ২৭ কোটি ১৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলার প্রস্তুতি চলছে। দুদকের উপপরিচালক মানসী বিশ্বাসের নেতৃত্বে একটি দল অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
সাত মামলায় জালিয়াতির বিস্তৃত বিবরণ:
দুদকের অনুমোদিত সাতটি মামলা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। বৈধ মর্টগেজ ছাড়াই ঋণ অনুমোদন, একই সম্পত্তি একাধিকবার বন্ধক দেখানো এবং কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ—এসব ছিল চক্রটির মূল পদ্ধতি।
প্রথম মামলা:
অ্যারিস্টোক্রেট কর্পোরেশনের নামে কোনো মর্টগেজ দলিল বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ছাড়াই ৭২ লাখ টাকা ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়। পরবর্তীতে আসল ও সুদসহ প্রায় ৭৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ মামলায় ৭ জন আসামি রয়েছেন, যার মধ্যে ব্যাংকের সাবেক এমডি শফিক বিন আব্দুল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রয়েছেন।
দ্বিতীয় মামলা:
বেঙ্গল এক্সপ্রেসের নামে কোনো বৈধ জামানত ছাড়াই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। ৮০ লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এ মামলায় ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে আবুল খায়ের, তার স্ত্রী জিনাত চৌধুরী এবং ছেলে আবরার খায়ের রয়েছেন।
তৃতীয় মামলা:
একই কৌশলে ঋণ গ্রহণ করে তা পরিশোধ না করে ৬১ লাখ ২ হাজার ৬২১ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। বেঙ্গল এক্সপ্রেস সংশ্লিষ্ট একই চক্র আবারও একইভাবে জালিয়াতি করে। এ মামলাতেও ১০ জন আসামি রয়েছে।
চতুর্থ মামলা:
ইয়াসিন এন্টারপ্রাইজের নামে কম মূল্যের সম্পত্তিকে অতিমূল্যায়ন করে এবং ভিন্ন সম্পত্তিকে মর্টগেজ দেখিয়ে ৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে আসল ৬ কোটি ৭৬ লাখ ৫১ হাজার ৯২৯ টাকা এবং সুদ ২ কোটি ৫০ লাখ ১৬ হাজার ৫৩৩ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ মামলায় ১০ জন আসামি রয়েছে।
পঞ্চম মামলা:
অরণ্য ক্রাফটস লিমিটেডের নামে কোনো বৈধ জামানত ছাড়াই ৮০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে আসল ও সুদসহ ৫০ লাখ ৩১ হাজার ৭৪২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। এখানে আবুল খায়েরের মেয়ে নওশীন খায়ের ও তার স্বামীও অভিযুক্ত।
ষষ্ঠ মামলা:
তমা স্যাটেলাইটের অনুকূলে জামানত ছাড়াই ৭০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৭২১ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ। এ মামলায় ৯ জন আসামি রয়েছে।
সপ্তম ও সবচেয়ে বড় মামলা:
সবচেয়ে বড় এ ঘটনায় একই সম্পত্তি একাধিক ব্যাংকে মর্টগেজ দেখিয়ে ২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়। পরে আসল ও সুদসহ ১৫ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়। এর মধ্যে ১৩ কোটি ৭২ লাখ ১৩ হাজার ৬৭০ টাকা এবং সুদ ১ কোটি ৪৮ লাখ ১৯ হাজার ৭৪৯ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুদকের অনুসন্ধানে এটিকে একটি সুপরিকল্পিত জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ মামলায় ১১ জন আসামি রয়েছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের সাবেক এমডি শফিক বিন আব্দুল্লাহ মালয়েশিয়ার নাগরিক। তিনি মালয়েশিয়ান আইসিবি ফাইনান্সিয়াল গ্রুপের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। ব্যাংকটির ৫২ শতাংশ শেয়ারও ওই গ্রুপের হাতে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশে চাকরি ছেড়ে মালয়েশিয়ায় ফিরে গেছেন বলে জানা গেছে।
পুরো ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট, ব্যাংকের ভেতরের কর্মকর্তা এবং বাইরের ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতি চালিয়ে গেছে। একই সম্পত্তি বারবার মর্টগেজ দেখানো, ভুয়া মূল্যায়ন এবং কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া এই তিন কৌশলই ছিল লুটপাটের মূল ভিত্তি। এখন নজর দুদকের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে মামলা দায়ের ও বিচারিক প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়!

