বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার পরই তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসছে।
বিশেষ করে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল ব্যবহারে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। অভিযোগ উঠেছে তহবিল তছরুপ, স্বজনপ্রীতি এবং স্বার্থের সংঘাতের।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন মোট ১২ জন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম সময় দায়িত্ব পালন করেছেন মনসুর। তাঁর মেয়াদ ছিল মাত্র এক বছর ছয় মাস ১৭ দিন। স্বল্প সময়ের এই দায়িত্বকালেই তিনি নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে আলোচনায় উঠে আসেন। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আড়াই বছর আগেই তাঁকে সরিয়ে দেয় সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতীতে সিএসআর তহবিল সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনসহ নানা প্রকল্পে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে মনসুরের সময়ে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত বা সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গায় তাঁর ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর প্রতিষ্ঠিত খলিল-মালিক ফাউন্ডেশনকে সিএসআর তহবিল থেকে তিন কোটি টাকা দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ক্যান্সার ও কিডনি রোগীদের সহায়তার উদ্দেশ্যে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। দ্রুত অর্থ ছাড়ের জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে চাপ ছিল বলেও দাবি কর্মকর্তাদের।
এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের জন্য ২৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গভর্নর নিজে স্ত্রীসহ উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নীতিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুদানের নজির থাকলেও সরকারি বিদ্যালয়ে সহায়তার উদাহরণ কম। তবুও তাঁর শৈশবের স্কুল নীলফামারী উচ্চ বিদ্যালয় অনুদান পায়, যা নিয়ে আপত্তি উঠলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, টাঙ্গাইলের করটিয়ায় তাঁর মালিকানাধীন বাগানবাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিদ্যালয়—যার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিও তিনি—সেখানেও সিএসআর তহবিল থেকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনায় স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত দেখা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর তার লভ্যাংশ থেকে সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করে। নির্দিষ্ট সীমা না থাকলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ ব্যবহৃত হয়। ২০২৫ সালে যেমন জুলাই আন্দোলনের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ২৫ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছিল।
অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে নিজের পরিচিত মহলে তহবিল বণ্টনের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় ১৮ মাস দায়িত্বে ছিলেন মনসুর। এই সময়েই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমতে থাকে। তবে একই সময়ে তিনি ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার ও শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
সরকারের নির্দেশে ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।তবে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বড় ধরনের দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি। বরং কঠোর নজরদারি ও তদন্তের কারণে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং পুঁজিবাজারে স্থবিরতা দেখা দেয়। এতে প্রশ্ন উঠেছে, ঘোষিত অভিযানের ফলাফল কতটা কার্যকর ছিল।
এদিকে গভর্নর সচিবালয় থেকে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে নিয়মিত ফ্রিজ করা হিসাবসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার নির্দেশ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামো অনুযায়ী এ ধরনের তথ্য সংরক্ষণে কঠোর বিধান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব তথ্য একটি ঘনিষ্ঠ চক্রের কাছে পৌঁছাত, যারা ফ্রিজকৃত হিসাব চালুর নামে অর্থ আদায় করত। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ হয়নি।
এ ছাড়া সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রায় দুই কোটি টাকার বিলাসবহুল এমপিভি গাড়ি কেনার অভিযোগও উঠেছে। বলা হচ্ছে, যথাযথ দরপত্র ছাড়াই এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে এই ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ড. আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বকাল একটি দ্বৈত চিত্র তুলে ধরে একদিকে সংস্কারের ঘোষণা, অন্যদিকে অনিয়ম ও বিতর্কের অভিযোগ।

