বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক কল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক গেটওয়ে অপারেটরস ফোরাম (আইওএফ) সিন্ডিকেটের আর্থিক অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ইস্যু। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একবার আবার প্রশ্ন উঠেছে, সিন্ডিকেটের মূল নেপথ্য কারিগররা কি আইনের মুখোমুখি হবেন, নাকি আগের মতো প্রভাবের আড়ালে থাকবেন?
খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্ক টপোলজির আড়ালে গত এক দশকে সরকারের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে ‘দরবেশ’ খ্যাত সালমান এফ রহমানের অধীনে সাতটি আন্তর্জাতিক গেটওয়ের প্রভাবে চালু ছিল।
আইওএফ কাঠামোর অধীনে গঠিত ‘মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ (এমডিএফ/এমডিএস) থেকে ৫৬৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) গুলশান থানায় একটি মামলা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কাঠামোগত সংস্কার নয়, কার্যকর প্রয়োগ ও স্বচ্ছ অডিট ছাড়া অতীতের অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের হওয়া সম্ভব নয়।
টেলিকম বিশেষজ্ঞ নুরুল কবির বলেন, “নয় বছর ধরে চলা এ রাষ্ট্রীয় কোষাগার ক্ষয় বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ টেকনো-কমার্শিয়াল অডিট জরুরি। আইওএস কাঠামো, রেট-সেটিং মেকানিজম ও এমডিএস ব্যয়ের ফরেনসিক অডিট ছাড়া প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাবে না।” এই বিষয়ে জানতে আইওএফ প্রেসিডেন্ট আসিফ রব্বানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত ও নীতিগত পরিবর্তন বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
আইএলডিটিএস নীতি বনাম আইওএস বাস্তবতা:
২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক কল ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে প্রণীত হয় আইএলডিটিএস নীতিমালা। লক্ষ্য ছিল ভিওআইপি জালিয়াতি বন্ধ করা, সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং একটি কাঠামোবদ্ধ বাজার তৈরি করা। সেদিনের নিয়ম অনুযায়ী আন্তর্জাতিক কল বাংলাদেশে আনার দায়িত্ব দেওয়া হয় আইজিডব্লিউ অপারেটরদের। তারা আইসিএক্স হয়ে কল মোবাইল অপারেটরের কাছে পৌঁছে দিত এটাই ছিল তিন স্তরের কাঠামোর মূল লক্ষ্য।
কিন্তু ২০১৫ সালে বিটিআরসির নির্দেশনায় চালু হয় আইজিডব্লিউ অপারেটরস সুইচ (আইওএস)। এর মাধ্যমে আইজিডব্লিউ অপারেটরদের ফোরাম আইওএফ একটি পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্ক টপোলজি বাস্তবায়ন করে। অভিযোগ আছে, এই আইওএস-কেন্দ্রিক কাঠামো ২০১০ সালের আইএলডিটিএস নীতিমালার ধারা ৫.২.৫-এর পরিপন্থী। মূল ধারায় বলা হয়েছিল, আইজিডব্লিউর আইসিএক্সের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ বাধ্যতামূলক।
আইওএস চালুর পর সব আন্তর্জাতিক কল একটি ‘কমন পয়েন্ট’ দিয়ে পাস করতে শুরু করে, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল আইওএফ-এর হাতে। ফলে সাতটি প্রভাবশালী আইজিডব্লিউ অপারেটরের হাতে আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন রেট নির্ধারণের প্রভাব চলে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রতিযোগিতা আইন ২০১২-এর ধারা ১৫ ও ১৬-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অভিযোগ আছে, সাতটি বড় আইজিডব্লিউ অপারেটর মোট রাজস্বের প্রায় ৬০ শতাংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করত, বাকি ৪০ শতাংশ বাকি ২০–২২টি ছোট অপারেটরের জন্য ছাঁটানো হতো।
ফ্লোর রেট, উচ্চ টার্মিনেশন চার্জ ও রাজস্ব ক্ষতি:
সরকার আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশনের জন্য একটি ‘ফ্লোর রেট’ বা সর্বনিম্ন হার নির্ধারণ করেছিল। তবে অভিযোগ আছে, বাস্তবে অনেক সময় কল টার্মিনেশন হয়েছে এই নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি দামে। এর ফলে রাজস্ব ভাগাভাগি করা হয়েছে নিম্ন ফ্লোর রেট ধরে, আর অতিরিক্ত অর্থের সুফল গেছে আইওএফ গোষ্ঠীর কাছে।
বিটিআরসি একাধিকবার ফ্লোর রেট কমালেও বাজারে কলের পরিমাণ কমে গেছে এবং অবৈধ ভিওআইপি কলের পরিমাণ বেড়েছে। বর্তমানে দৈনিক আন্তর্জাতিক কলের সময়কাল ১০ কোটি মিনিট থেকে নেমে এক কোটি মিনিটের কিছু বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজস্বও একইভাবে কমেছে।
টেলিকম বিশেষজ্ঞদের মতে, “নয় বছর ধরে চলা এই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষয় বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ টেকনো-কমার্শিয়াল অডিট জরুরি। আইওএস কাঠামো, রেট সেটিং মেকানিজম এবং এমডিএস ব্যয়ের ফরেনসিক অডিট ছাড়া প্রকৃত চিত্র বের করা সম্ভব হবে না।”
এমডিএফ/এমডিএস তহবিল: ৬০০ কোটি টাকার রহস্য:
আইওএফ কাঠামোর অধীনে গঠন করা হয় ‘মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ (এমডিএফ/এমডিএস)। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তহবিলে জমা পড়ে ৬৩১ কোটি টাকার বেশি, যার মধ্যে ৬২৫ কোটি টাকার বেশি খরচ দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এর অন্তত ৯৫ শতাংশ অর্থ গিয়েছে বেক্সিমকো কম্পিউটারস লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে, যেখানে কোনো আইজিডব্লিউ লাইসেন্স নেই। এ ঘটনার কারণে তহবিলের প্রকৃত ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফৌজদারি মামলা ও ২৭ আসামি:
মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (এমডিএফ) থেকে ৫৬৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিটিআরসি ২০২৫ সালে রাজধানীর গুলশান থানায় মামলা দায়ের করেছে। মামলাটি টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ (সংশোধনী ২০১০)-এর ৭৩, ৭৪, ৭৬ ধারা এবং দণ্ডবিধি ৪২০/৪০৬ অনুযায়ী দায়ের করা হয়।
মামলায় ২৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আছেন সালমান এফ রহমানের পরিবারের সদস্যরা এবং আইওএফের নির্বাহী কমিটির একাধিক সদস্য। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাইসেন্স ও চুক্তির শর্ত ভঙ্গ, প্রতারণা এবং তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত ১২ জন এজাহারনামীয় আসামি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন। আদালত পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকায় তাদের জামিন মঞ্জুর করেছেন। তবে অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সিদ্ধান্ত নির্ধারকরা এখনও আইনের আওতায় আসেননি।
চুক্তি বাতিল ও নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা:
সাম্প্রতিক বৈঠকে আইওএফ ও আইজিডব্লিউ অপারেটরদের মধ্যকার অপারেশনাল চুক্তির অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কল ব্যবস্থাপনায় নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ব্যাংক গ্যারান্টি এবং মনিটরিং জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

