বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে বিচারাধীন একটি দুর্নীতির মামলা হঠাৎ করে প্রত্যাহার করায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাটি শুরু থেকে তদন্ত, চার্জশিট দাখিল এবং অভিযোগ গঠন—সব ধাপ অতিক্রম করে বিচার শুরুর পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ঠিক সেই সময়েই কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই এটি প্রত্যাহার করা হয়, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, বিচারাধীন কোনো মামলা প্রত্যাহারের আগে আদালতের অনুমতি নিয়ে পুনঃতদন্ত করা বাধ্যতামূলক। পুনঃতদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে মামলাটি উদ্দেশ্যমূলক, হয়রানিমূলক বা আইনগত ভিত্তিহীন, তবেই তা প্রত্যাহারের আবেদন করা যায়। তবে আবুল খায়েরের মামলায় অভিযোগ গঠনের সময় পুনঃতদন্তের আবেদন করা হলেও তা সম্পন্ন না করেই মাত্র তিন দিনের মধ্যে মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয় দুদক। এতে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদকের এই পদক্ষেপ তাদের আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। তার মতে, অনৈতিক চাপ, অসৎ উদ্দেশ্য বা নিজেদের সীমাবদ্ধতা আড়াল করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ একটি নেতিবাচক নজির সৃষ্টি করে এবং সংস্থাটির স্বাধীনতা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুতর কোনো ত্রুটি ছাড়া বিচারাধীন মামলা প্রত্যাহার করা উচিত নয়। তারা মনে করেন, দুদকের প্রতিটি অনুসন্ধান, মামলা দায়ের এবং চার্জশিট কমিশনের অনুমোদনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। সেক্ষেত্রে অনুমোদনের সময় কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পুনঃতদন্ত ছাড়া মামলা প্রত্যাহার করা আইনসঙ্গত নয় বলেও তারা মত দেন। তাদের ভাষ্য, যথেষ্ট প্রমাণসমৃদ্ধ দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করা অনৈতিক এবং আইনের অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মামলার পটভূমি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২২ সালের মার্চে আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। প্রায় এক বছর পর তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে ৯০ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি করেন দুদকের তৎকালীন উপপরিচালক মোনায়েম হোসেন।
পরবর্তী এক বছরে তদন্তে নথিপত্র জব্দ, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত ১৫ আগস্ট চার্জশিট গ্রহণ করে এবং নথি পর্যালোচনার জন্য ১ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেন।
নির্ধারিত দিনে দুদক মামলার অধিকতর তদন্তের আবেদন জানায় এবং পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে। তবে কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। আদালত শুনানির জন্য ১৫ অক্টোবর তারিখ নির্ধারণ করেন। কিন্তু এর আগেই, ৪ অক্টোবর, দুদক হঠাৎ করে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করে। পরদিন ৫ অক্টোবর আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ ধারায় পলাতক আসামি আবুল খায়েরকে অব্যাহতি দেন।
প্রত্যাহারের আবেদনে কমিশনের অনুমোদনপত্র ছাড়া অন্য কোনো যুক্তি উপস্থাপন করা হয়নি। দুদকের একাধিক সূত্রের দাবি, তৎকালীন কমিশন বিশেষ উদ্দেশ্যে দ্রুততার সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সূত্র: খবরের কাগজ

