পুলিশে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার নিশ্চিত করতে গঠিত পুলিশ কমিশনের ক্ষমতা আরও সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আইজিপি নিয়োগে কমিশনের ভূমিকা বাদ দেওয়ার সুপারিশ সামনে আসায় পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করেছিল। এখন সেটিকে সংশোধন করে জাতীয় সংসদে বিল আকারে তোলার প্রস্তুতি চলছে। তবে সংশোধনের প্রস্তাব অনুযায়ী কমিশনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান অধ্যাদেশে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নিয়োগে কমিশনের সুপারিশের বিধান রয়েছে। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে এই বিধান বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, এত গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ কমিশনের হাতে থাকা যৌক্তিক নয়।
যদি এই পরিবর্তন কার্যকর হয়, তাহলে পুলিশ কমিশনের প্রভাব আরও কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে পুলিশ সংস্কারের মূল লক্ষ্য—রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার বাহিনী গঠন—বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা পুলিশে বড় ধরনের সংস্কারের দাবি তোলে। তাদের প্রত্যাশা ছিল একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে, যা পুলিশকে জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। তবে বর্তমান প্রস্তাব সেই প্রত্যাশাকে দুর্বল করছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
অধ্যাদেশটি নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা ছিল। অনেকেই মনে করেন, কমিশনকে প্রকৃত স্বাধীনতা না দিয়ে কেবল পরামর্শমূলক একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখন আবার আইজিপি নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে কমিশনকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় সেই সমালোচনা আরও জোরালো হচ্ছে।
এদিকে সংসদের বিশেষ কমিটি ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে বেশ কিছু সংশোধনের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশও রয়েছে। তবে এই সংশোধনের বিরোধিতা করেছেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। তারা মনে করেন, আইজিপি নিয়োগে কমিশনের ভূমিকা থাকলে পুলিশ রাজনৈতিক চাপমুক্ত থাকতে পারবে।
পুলিশ সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে একটি স্বাধীন ও কার্যকর পুলিশ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার পর সেই প্রস্তাবের অনেক দিকই দুর্বল হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কমিশনকে শুধু সুপারিশকারী সংস্থায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে বাস্তবিক পরিবর্তন আনা কঠিন হবে। এতে প্রতিষ্ঠানটি কাগুজে রূপেই থেকে যেতে পারে, অথচ রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়বে।
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারাও বলছেন, শুরু থেকেই বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের কারণে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠনের পথে বাধা তৈরি হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত কাঠামোটি জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সব মিলিয়ে, পুলিশ কমিশনকে ঘিরে নতুন করে যে সংশোধনের আলোচনা শুরু হয়েছে, তা সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

