দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও আর্থিক সংকটে থাকা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড- এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো কুড়িগ্রামেও বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের জমা অর্থ ফেরত না পাওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক আকার নিয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কোম্পানিটিকে গ্রাহকদের বকেয়া দাবি দ্রুত পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছে। প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রি করে হলেও অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোম্পানির হিসাবে বকেয়া দাবি প্রায় ১,৮০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা। তবে বিভিন্ন সূত্রে এই অঙ্ক প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকার কাছাকাছি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ১৯৪ কোটি টাকা, যা মোট দাবির খুবই সামান্য অংশ।
উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রামে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে প্রায় এক লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রায় ১০০ কোটি টাকার কোনো স্পষ্ট হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় ‘ইসলামী বীমা’ সুবিধার কথা বলে নিম্নআয়ের মানুষদের আকৃষ্ট করা হয়। গৃহিণী, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ছোট ছোট কিস্তিতে অর্থ জমা দেন। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পলিসির অর্থ পরিশোধ বন্ধ হয়ে যায়।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, কোম্পানির স্থানীয় অফিসগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে বা স্থানান্তর করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের পাওয়া যায় না, ফলে গ্রাহকদের বছরের পর বছর ঘুরতে হচ্ছে। কোম্পানি দাবি করছে, একটি সিরিয়াল অনুযায়ী ধাপে ধাপে টাকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই তালিকা এত দীর্ঘ যে অনেককে টাকা পেতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। এতে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ বকেয়া থাকায় পর্যায়ক্রমে অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। বিশেষ ক্ষেত্রে—যেমন মৃত গ্রাহকের পরিবার বা গুরুতর অসুস্থদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবে এই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংকট মোকাবেলায় কোম্পানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যেমন কর্মী ছাঁটাই ও সম্পদ বিক্রি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এত বড় দায় মেটাতে এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন কার্যকর পুনর্গঠন পরিকল্পনা।
এদিকে কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহক ও কর্মীদের তথ্য ফাঁসের অভিযোগও উঠেছে। বলা হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বাইরে চলে যাওয়ায় প্রতারক চক্র সুযোগ নিচ্ছে। তারা কোম্পানির পরিচয়ে ফোন করে ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
কোম্পানির পরিচালনায় আগেও পরিবর্তন এসেছে। অনিয়মের অভিযোগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২১ সালে বোর্ড পুনর্গঠন করে। নিরীক্ষায় বিপুল অর্থ লোপাটের তথ্যও উঠে আসে। বর্তমানে আইডিআরএ স্পষ্ট জানিয়েছে, দ্রুত বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা না দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, বরং দেশের পুরো বীমা খাতের ওপর আস্থার বড় সংকট তৈরি করছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষদের মধ্যে বীমা নিয়ে অনাস্থা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এমন সংকট ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

