সামরিক বাহিনীর কমব্যাট পোশাক পরা একাধিক ছবি। বুকের ওপর স্পষ্ট নেমপ্লেটে নাম লেখা। কাঁধে পদমর্যাদার র্যাংক ব্যাজ। সব মিলিয়ে যে কোনো সাধারণ মানুষের কাছে তাকে একজন প্রকৃত সেনা কর্মকর্তাই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তারা কেউই সেনাবাহিনীর সদস্য নন। এমনকি কোনো স্বীকৃত সংস্থার সঙ্গেও তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এই ধরনের ভুয়া পরিচয়ের আড়ালেই সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ একটি প্রতারক চক্র।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তার ছবি, নাম ও পদবিযুক্ত প্রোফাইল ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করছে অপরাধীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামে এই তৎপরতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
তারা মূলত টার্গেট ব্যক্তিদের আইডি হ্যাক করে। এরপর সেই আইডি ব্যবহার করে পরিচিত বা ঘনিষ্ঠজনদের কাছে জরুরি সমস্যার কথা বলে আর্থিক সহায়তা কিংবা ঋণ চাওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে হ্যাক করা আইডির ব্যক্তিগত ইনবক্সে থাকা তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। এতে ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে বড় অঙ্কের টাকা বা অন্যান্য সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়। সম্প্রতি একাধিক ভুক্তভোগী গণমাধ্যমের কাছে এ ধরনের প্রতারণার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, দিন দিন এই চক্রের সক্রিয়তা বাড়ছে এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা সহজেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মিন্টু ভূষণ রায় জানান, গত ১৪ মার্চ দুপুরে তিনি অফিসে কাজ করার সময় সেনাবাহিনীর পোশাক পরা ছবিযুক্ত একটি প্রোফাইল থেকে তাকে ফোন করা হয়। নম্বরটি ছিল ০১৬০৮-৫৭০৯৬৯। কল রিসিভ করার পর অপর প্রান্ত থেকে নিজেকে সেনা সদর দপ্তরের পরিচয় দেওয়া হয়।
তাকে বলা হয়, “যেকোনো কারণে আপনার ফেসবুক আইডি সেনাবাহিনীর স্পর্শকাতর একটি গ্রুপে যুক্ত হয়েছে, যা আপনার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকির বিষয়। আপনি কিছু তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছি।” প্রথমে সেনা কর্মকর্তার ছবি ও পরিচয় দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত হলেও পরে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হয় মিন্টু ভূষণ রায়ের। এরপর তিনি কলটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে যাচাই করেন এবং নিশ্চিত হন, এটি ছিল একটি প্রতারণামূলক কল।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ঢাকার গণমাধ্যমকর্মী স্বপ্না চক্রবর্তী। তিনি জানান, গত ২৩ মার্চ দুপুরে হোয়াটসঅ্যাপে একটি কল আসে, যেখানে কলার নিজেকে সেনা সদর দপ্তরের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ পরিচয় দেন। কলটি আসে ০১৭৩৩-৫১৩৭০৮ নম্বর থেকে, এবং প্রোফাইলেও সেনা পোশাক পরা কর্মকর্তার ছবি ব্যবহার করা ছিল। তার কাছ থেকেও ফেসবুক বা মেইলে পাঠানো ‘ওটিপি’ জানতে চাওয়া হয়। তবে স্বপ্না চক্রবর্তী সতর্ক থেকে বিষয়টি যাচাই করার কথা বলে কলটি কেটে দেন। পরে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে তিনি নিশ্চিত হন, এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের কাজ।
সম্প্রতি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একাধিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা এই ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে গত ২২ মার্চ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম তার ফেসবুক পোস্টে সতর্ক করে লেখেন, তার নাম, ছবি ও পদবি ব্যবহার করে একটি নম্বর থেকে (০১৭৮৬-৭০৮৮১২) বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ফোন করা হচ্ছে এবং টাকা চাওয়া হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, এটি তার ব্যক্তিগত নম্বর নয় এবং সবাইকে এ ধরনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করেন।
অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার এই নতুন প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ইন্টারনেটের বিস্তৃতি যত বাড়ছে, ততই অপরাধীদের কৌশলও পরিবর্তিত ও বিস্তৃত হচ্ছে।
তিনি জানান, সামরিক বাহিনীর নাম, পরিচয় ও প্রতীক ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা এখন পেশাদার প্রতারকদের একটি কার্যকর কৌশলে পরিণত হয়েছে। তার মতে, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক থাকা জরুরি। একই সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা বিভিন্ন সংস্থার পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে মনে করেন ডিফেন্স জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিজাব) সাবেক সভাপতি মামুনুর রশীদ।
তিনি বলেন, এই ধরনের অপতৎপরতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটভিত্তিক মাধ্যমে সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে প্রতারণার প্রবণতা অনেক বেড়েছে। তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট বাহিনী এ ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে সব সময় সতর্ক থাকে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন থাকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, প্রতারক চক্র সব সময় নতুন কৌশল ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণার চেষ্টা চালায়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পুলিশ সব ধরনের অপরাধ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে কাজ করছে। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

