রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে এখন প্রায় এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজস্ব খাতে বড় ধরনের ধস নেমেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতির পেছনে নীতিগত ও প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, অর্থনীতির এই অবনতির জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের দাবি, তিনি এমন সময়ে সরকারের প্রধান ছিলেন, যখন রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সিদ্ধান্ত ও পরিবর্তন নেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বেশি কর ফাঁকির বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছিল। তবে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর কোনো কর পরিশোধ ছাড়াই ওই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এটি ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ।
তার সময়কালে রাজস্ব ঘাটতি ও কর ফাঁকি উভয়ই বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে ‘সংস্কার’ কর্মসূচির অজুহাতে সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ বেড়েছে এবং শিল্প খাতেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তবে রাজস্ব সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বা ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হয় বলে জানা যায়। এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি বিভক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ায় অসন্তোষ দেখা দেয়। এর প্রতিবাদে কর্মকর্তাদের একটি অংশ আন্দোলনে নামলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে এক হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনের কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ অস্থিরতার কারণে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বকেয়া আদায় কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় ২২ শতাংশ কম আহরণ নির্দেশ করে।
এনবিআর সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মার্চ মাসে এসে এই ঘাটতি আরও বেড়েছে। গতকাল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা অতীতের তুলনায় নজিরবিহীন বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করছেন।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি এখন নতুন সরকারের কাঁধে। রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
এদিকে এনবিআরের বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত সদস্য ড. মো. আবদুর রউফ রাজস্ব খাতের সংস্কার ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে টেকসই সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে বলেছিলাম। কিন্তু আইএমএফ-এর দোহাই দিয়ে অপরিণামদর্শী সংস্কার করতে গিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাতের চেষ্টা করলেও তিনি সাক্ষাৎ পাননি। তার ভাষায়, আন্দোলন জোরদার হওয়ার পর “অজ্ঞাত কারণে একজন সচিবকে পদে বহাল রাখতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা, দুদকসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন শক্তি নিয়োজিত করা হয়।” তিনি আরও দাবি করেন, “সহজ বিষয়কে অদূরদর্শিতার সঙ্গে পরিচালনা করায় তা জটিল হয়ে পড়ে।”
ড. আবদুর রউফের দাবি, বর্তমানে নির্বাচিত সরকার বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছে এবং অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তার মতে, “হঠকারি সংস্কার কর্মসূচি বাদ দিয়ে দেশীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমঝোতামূলক সংস্কার ছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো আরেকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, “ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচার ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে রাজস্ব খাতে ধস নামে।” তিনি আরও দাবি করেন, “তিনি প্রভাব খাটিয়ে নোবেল পুরস্কারের আয় করমুক্ত করেছেন। পাশাপাশি গ্রামীণ টেলিকমের ৬০০ কোটি টাকার আয়কর মওকুফ করিয়ে নিয়েছেন।” তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা যায়নি।
রাজস্ব আইনে নতুন করে একটি বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার থেকে অর্জিত আয়ের ওপর করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংশোধিত ওই বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নোবেল, র্যামন ম্যাগসাইসাই, বুকার, পুলিৎজার, সিমন বলিভার, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস, গ্র্যামি, এমি, গোল্ডেন গ্লোব, কান চলচ্চিত্র উৎসবসহ বিভিন্ন পুরস্কার থেকে যে আয় পাবেন, তা করমুক্ত থাকবে।
সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ থেকে একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ২০২৫ সালে রাজা তৃতীয় চার্লস হারমনি পুরস্কার, ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম, ১৯৮৪ সালে র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার এবং ১৯৮৭ সালের স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারসহ ১৪৫টির বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
নোবেল পুরস্কারের কাঠামো অনুযায়ী, বিজয়ীরা একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ এবং নোবেল ফাউন্ডেশনের নির্ধারিত অর্থ পান। ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইউনূস ওই অর্থ পান, যার পরিমাণ ছিল ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার। তখনকার বিনিময় হার অনুযায়ী এটি প্রায় ১০ কোটি টাকা বা ১.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান ছিল। অন্যদিকে র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের ক্ষেত্রে বিজয়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে স্বর্ণপদক, সনদ এবং ৫০ হাজার মার্কিন ডলার নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, চলতি বাজেটে বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার আয় করমুক্ত করা হয়েছে, যা সাধারণত বিরল এবং নির্দিষ্ট সীমিত ব্যক্তিরাই অর্জন করেন। তিনি বলেন, “হঠাৎ করে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। জাতীয় বাজেটে কোনো ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দেওয়া উচিত নয়।”
তিনি আরও বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ টেলিকমের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার আয়কর মওকুফ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, আয়কর আইনে কর অব্যাহতির যে পরিধি নির্ধারিত, তা উপেক্ষা করে এই বড় অঙ্কের মওকুফের ঘটনা বিরল।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান দুই বছর আইসিএমএবি’র প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এনবিআরের বাজেট প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। ওই সময়ে তিনি নোবেল পুরস্কারের করমুক্তির বিষয়ে সুপারিশ করেননি। তবে ২০২৪-২৫ সালে সরকার প্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের প্রভাবের কারণে পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কারের আয় করমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন।
এনবিআরের সাবেক সদস্য (অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো) আলমগীর হোসেন বলেন, আন্দোলন চলাকালে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাবেক সরকার প্রধান ড. ইউনূসের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন। তবে তিনি সহযোগিতা না করে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন বলে তার দাবি। এর ফলে এনবিআরে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ধস নামে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজস্ব খাতের সংস্কারে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সদস্য ও এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন বলেন, সংস্কার কমিটির অধিকাংশ সুপারিশ উপেক্ষা করে আইএমএফ-এর সুপারিশকে অগ্রাধিকার দিয়ে এনবিআর বিভক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার মতে, কোনো ধরনের অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় রাজস্ব খাতে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, এর আগে কোনো সরকারপ্রধান নিজের ক্ষেত্রে আইন প্রণয়ন করে কর পরিশোধের বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছেন—এমন নজির নেই। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ও নীতিগত প্রশ্ন উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে। তবে পরবর্তীতে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটি এই অধ্যাদেশসহ বেশ কিছু অধ্যাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে সংসদে উত্থাপন না করার সুপারিশ করে। এতে করে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই অধ্যাদেশ জারিকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক অঙ্গনে গুরুতর বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এতে বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক ধাপ অনুসরণ করা হয়নি, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা করা হয়েছে, সচিব কমিটির সুপারিশ ছাড়াই অনুমোদন নেওয়া হয়েছে এবং জনপ্রশাসন ও অর্থ বিভাগকে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রের বরাতে জানা যায়, গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, শ্রমিক-কর্মচারীদের লভ্যাংশের অর্থ আত্মসাৎ এবং কল্যাণ তহবিলের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একটি প্রামাণ্যচিত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বিদেশি তহবিল হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে সরবরাহ হলেও সেই অর্থ অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের অভিযোগ সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শতাধিক পণ্য ও সেবার ওপর নতুন ভ্যাট আরোপের ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) বলেন, ব্যবসায়ীরা একাধিকবার সমস্যার বিষয়ে আলোচনার জন্য সময় চাইলেও সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি। তার মতে, আলোচনা ছাড়াই নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং রাজস্ব খাতে সংকট তৈরি করেছে।

