রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল–এ দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থ আত্মসাতের একটি ঘটনা অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রকাশ্যে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক অফিস সহকারী নথি জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত রিয়াজ উদ্দিনকে গত ৯ মার্চ গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকার করেন। তদন্তে জানা যায়, আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে তিনি সাভারে জমি কেনেন এবং স্বর্ণালঙ্কারও সংগ্রহ করেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এইচ এম রেজওয়ানুর রহমান জানান, প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তথ্য গোপন রাখতে তিনি প্রায় ২০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, সফটওয়্যারের তথ্য কারসাজির মাধ্যমে হাসপাতালের বিভিন্ন সেবা থেকে আদায়কৃত অর্থের হিসাব গরমিল করা হতো। প্রকৃত আয় ও ব্যাংকে জমার অঙ্কের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে বছরের পর বছর এই অনিয়ম চালানো হয়েছে। নিরীক্ষার সময়ও বিষয়টি ধরা পড়েনি।
হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী, টিকিট, রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, কেবিন-শয্যা, রক্ত সংগ্রহ ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার ফি হিসাব করে সপ্তাহে দু’দিন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযুক্ত কর্মী সফটওয়্যারে তথ্য পরিবর্তন করে কম অর্থ জমা দেখাতেন এবং ব্যাংকের চালানেও একই ধরনের কারসাজি করতেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক নিরীক্ষায় প্রথমে ৮৬ লাখ টাকা জমা না দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। পরে গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গত পাঁচ বছরের তথ্য যাচাই করে। এতে দেখা যায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৪২ লাখ ৮৯ হাজার ৫৮৫ টাকা এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৭৪ টাকা—মোট ১ কোটি ৯৯ লাখ ৮০ হাজার ১৫৯ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়নি।
জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াজ উদ্দিন দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা জমাকৃত অর্থ থেকে অংশ নিয়েছিলেন। তবে তিনি এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উপপরিচালক ডা. হালিমা সুলতানা হক বলেন, নিজেকে রক্ষার চেষ্টা থেকেই অন্যদের নাম জড়ানো হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা রফিকুল হোসেন জানান, জমা দেওয়া কাগজপত্র প্রথমে সঠিক মনে হলেও সফটওয়্যারের কারসাজি নজরে আসেনি। হিসাবরক্ষক হানিফ মিয়া বলেন, অভিযুক্ত কর্মীর কাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং তিনি কোনো অর্থ গ্রহণ করেননি।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রিয়াজ উদ্দিন ২০১৪ সালে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে যোগ দেন এবং ২০১৮ সালে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই অনিয়ম শুরু হয়।
এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন–এ লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এস এম এম কাদির জানান, তদন্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইন শাখায় পাঠানো হয়েছে এবং নির্দেশনা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

