রাহাদ সুমন,বরিশাল প্রতিবেদক
মাত্র দুই বছর বয়স সিদরাতুল মুনতাহার। মা তার কবরে আর বাবা জেলখানায়। এ বয়সেই যৌতুক নামের অভিশাপ মাকে কেড়ে নিয়ে তার জীবনকে অসহায় ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। মুনতাহা আর কোনদিন মায়ের আদর-সোহাগ পাবেনা। মা তাকে কোলে নিয়ে আদর করে আর কোনদিন দুগ্ধ্ পান করাবেন না। পরম মমতায় খাইয়ে দেবেন না। কারন ঘাতক বাবা মুনতাহার মাকে নির্মম নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে।
মাকে হারিয়ে মুনতাহার অনবরত কান্না স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও অশ্রুজলে ভাসাচ্ছে। সবার মাঝে মুনতাহা তার মাকে খুঁজে ফিরছে। বিশেষ করে কোন নারীকে দেখলে তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মায়ের দুধপান করার জন্য ছটফট করছে সে। কিন্তু কোথাও নেই তার মা। মা কবরে, বাবা জেলে— কি ভবিষ্যৎ শিশু মুনতাহার !
নানা-নানীর কোলে চড়ে মায়ের কবরের কাছে গিয়ে মা মা বলে ডাকছে সে। তার এ কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। শিশু মুনতাহার চোখের সামনে পাষন্ড বাবা তার মাকে নির্মম ভাবে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে। মৃত্যুর আগেও বিভিন্ন সময় তার চোখের সামনে মাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও মারধর করা হত। যা তার শিশুমনে গভীর দাগ কাটে। তার চোখেমুখে আতঙ্ক-উৎকন্ঠা ও বিষাদের ছাপ। বাবা তার মাকে কিভাবে মারতো মুনতাহাকে জিঙ্গেস করা হলে নিজের দুহাত দিয়ে সে তার মাথায় আঘাত করে দেখায়। বাবার প্রতি কোন টান নেই তার। চোখের সামনে মাকে মেরে ফেলতে দেখে হয়তো তার শিশুমনে বাবার প্রতি ঘৃনা সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে মা হারা নাতনী মুনতাহাকে নিয়ে দরিদ্র নানা-নানীর চোখে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। মেয়েকে হারিয়ে শোকে স্তব্দ তারা। মাতৃহারা নাতনীকে কিভাবে বড় করে তুলবেন সে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা। মুনতাহার নানা হুমায়ুন কবির হাওলাদার বলেন, পাষন্ড জামাই মেয়েটাকে নির্মম নির্যাতন করে মেরে ফেললো। মায়ের জন্য ব্যাকুল মুনতাহার কান্না থামছে না, দুধপান করার জন্য ছটফট করছে। রাতে ঘুমায় না সে। সবার মাঝে মাকে খুঁজে ফিরছে । এতটুকু শিশুর কথা ভাবলো না ওর পাষন্ড বাবা।
প্রসঙ্গগত, বানারীপাড়া উপজেলার সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব সলিয়াবাকপুর গ্রামের
বাসিন্দা হুমায়ুন কবির হাওলাদারের মেয়ে মারিয়া আক্তারের সঙ্গে প্রায় তিন বছর আগে একই এলাকার রবিউল মৃধার পারিবারিক ভাবে বিবাহ হয়। তাদের সংসারে সিদরাতুল মুনতাহা নামের দুই বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। জীবিকার তাগিদে তারা রাজধানী ঢাকায় নন্দীপাড়ার ছোট বটতলায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। রবিউল সেখানে লেগুনা গাড়ির চালক। যৌতুকের টাকার দাবি পূরণ ও বিয়ের সময়ে প্রতিশ্রুত স্বর্নের কানের দুল দিতে না পারা এবং মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে রবিউল স্ত্রী মারিয়াকে মানসিক ও শারিরীকভাবে নির্যাতন করতেন। স্ত্রীকে নির্যাতনে রবিউলকে তার মা ও বোন ইন্ধন যোগাতেন। রমজান মাসে রবিউল তার স্ত্রী মারিয়াকে বাবার বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা এনে দিতে বলেন। চা দোকানী দরিদ্র বাবার কাছ থেকে টাকা এনে দিতে অস্বীকৃতি জানানো এবং বাসায় বসে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় তাকে প্রায়ই মারধর করা হতো।
এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার (৪ এপ্রিল) রবিউল মৃধা স্ত্রী মারিয়াকে অমানবিকভাবে মারধর করে। এ সময় পিটিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করা হয়। এমনকি তার সংবেদনশীল অঙ্গেও আঘাতের অভিযোগ রয়েছে। নির্মম নির্যাতনের পরে তাকে কোন চিকিৎসাও করানো হয়নি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় বাসায় ফেলে রাখা হয়। অসুস্থতার কারনে বাসায় রান্না করতে না পারায় দ্বিতীয় দফা তাকে মারধর করা হয়। মারিয়ার গুরুতর অসুস্থ অবস্থার খবর পেয়ে তার মা হাফিজা বেগম ঢাকায় ছুঁটে যান।
সেখান থেকে বুধবার (৮ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে গুরুতর আহত মারিয়াকে বানারীপাড়ায় পূর্ব সলিয়াবাকপুর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বাড়িতে আসার পর অবস্থার অবনতি ঘটলে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাকে বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে আসার পর চিকিৎসাধিন অবস্থায় দুপুর ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে থানা পুলিশ হাসপাতাল থেকে মারিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য বরিশাল শেবাচিম হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। বুধবার রাতেই রাজধানীর নন্দীপাড়ার ছোট বটতলার ভাড়াটিয়া বাসা থেকে ঘাতক স্বামী রবিউল মৃধাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালে রবিউলকে বরিশাল জেলহাজতে আর সন্ধ্যায় জানাজা শেষে মারিয়ার মরদেহ বাবার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

