ঢাকা মহানগরীর সড়কে সিএনজি অটোরিকশার দাম ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। যে যানটির প্রকৃত বাজারমূল্য প্রায় ৬ লাখ থেকে ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা, সেটিই রাস্তায় নামাতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।
অর্থাৎ একদিকে উৎপাদন বা মূল দামের সঙ্গে বাস্তব খরচের পার্থক্য আকাশ-পাতাল, অন্যদিকে এই ব্যবধান তৈরি করছে এক ধরনের অদৃশ্য চাপ ও জটিল প্রক্রিয়া। ক্রেতাদের অভিযোগ, একটি সিএনজি অটোরিকশা কিনতে গেলে তারা পড়ে যান এক অদ্ভুত জটিলতার মধ্যে। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী ও একটি প্রভাবশালী চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করে দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সাধারণ ক্রেতার জন্য এই যান কেনা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, নিয়মনীতি ও নজরদারির ঘাটতির কারণেই বাজারে এমন নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে ঢাকার সড়কে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার প্রকৃত দামের সঙ্গে চূড়ান্ত ব্যয়ের এই বিশাল ব্যবধান এখন নগরবাসীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অতীত ও বর্তমান পরিসংখ্যান:
২০০১ সাল থেকে ঢাকার সড়কে পরিবেশবান্ধব সিএনজি অটোরিকশার যাত্রা শুরু হয়। পেট্রোল ও ডিজেলের তুলনায় কম দূষণকারী হওয়ায় টু-স্ট্রোক বেবিট্যাক্সির পরিবর্তে সবুজ রঙের এই বাহনকে ধীরে ধীরে নগর পরিবহনের অংশ করা হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে রাজধানীতে ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা চালু করা হয়। এরপর মিশুক যানবাহনের প্রতিস্থাপন হিসেবে আরও ২ হাজার ৬৯৬টি সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়। প্রতিটি যানবাহনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছিল ১৫ বছর।
বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকায় একটি নতুন সিএনজি অটোরিকশার প্রকৃত বাজারমূল্য যেখানে প্রায় ৬ লাখ টাকা, সেখানে নতুন নিবন্ধন বন্ধ থাকায় সেটির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টাকায়। অভিযোগ রয়েছে, পুরোনো নম্বর প্লেট ও নিবন্ধনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটি দালালচক্র, কিছু অসাধু মালিক এবং সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিচ্ছে। ফলে সাধারণ চালকদের জন্য এই যানবাহন এখন প্রায় নাগালের বাইরে চলে গেছে।
সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদ এবং ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরীতে বৈধভাবে চলমান সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৯৬টি। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর তথ্য বলছে, শুরু থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় মোট ২০ হাজার ৯৯৫টি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে।
বিআরটিএর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৮ ও ২০১৯ সালেই সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। ওই দুই বছরে যথাক্রমে ৫ হাজার ৬৩৭টি এবং ৬ হাজার ৮৩৯টি সিএনজি অটোরিকশা নিবন্ধিত হয়। তবে গত পাঁচ বছরে নতুন নিবন্ধনের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৪৪৫টিতে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার সড়কে সিএনজি অটোরিকশা এখন অনেকের কাছে ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হয়েছে। একবার মালিক হতে পারলে এটি লাভজনক মনে হলেও, সেখানে পৌঁছানোর পথটি ক্রমেই জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। নতুন একটি সিএনজি কেনার বাস্তবতা এখন অনেক চালকের কাছেই এক ধরনের দীর্ঘ গোলকধাঁধা।
কী এই ঘোরপ্যাঁচের খেলা?
বাংলাদেশের বাজারে একটি সিএনজি অটোরিকশার শোরুম মূল্য গড়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা কিন্তু এই গাড়ি কিনলেই রাস্তায় নামানোর জন্য প্রয়োজনীয় নিবন্ধন বা নম্বর প্লেট পাওয়া যায় না। বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী, একটি সিএনজি অটোরিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ১৫ বছর পূর্ণ হলে সেটি বাতিল করে একই মালিককে নতুন গাড়ি প্রতিস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। এই সীমিত ব্যবস্থার কারণে নতুন করে সহজে নিবন্ধন পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি বড় অস্বচ্ছ বাণিজ্য।
সিএনজি চালকদের অভিযোগ, কাগজপত্রে একটি গাড়ির সরকারি নিবন্ধন ব্যয় মাত্র ১২ হাজার ৪৩৯ টাকা হলেও বাস্তবে তা পাওয়া যায় না। ফলে কেবল নামমাত্র খরচে মালিক হওয়া সম্ভব হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নতুন নিবন্ধন বন্ধ থাকায় পুরোনো গাড়ির নম্বর প্রতিস্থাপন ব্যবস্থাই এখন একমাত্র পথ। এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে শক্তিশালী একটি চক্র, যেখানে দালাল, কিছু মালিক এবং সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে কালো টাকার মালিকদের প্রভাবও বাড়ছে বলে দাবি করছেন অনেকে।
বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর প্রায় ১৫ হাজার সিএনজি অটোরিকশার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সীমিত সংখ্যক মালিকের হাতে। চালকদের অভিযোগ, মাত্র প্রায় এক হাজার মালিক পুরো খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন নিবন্ধন না থাকায় পুরোনো একটি নম্বর প্লেট পেতে দালালদের মাধ্যমে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। একই সঙ্গে পুরোনো ব্যবহৃত গাড়ির জন্য মালিককে আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা দিতে হয়। সব মিলিয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশা রাস্তায় নামাতে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকায়।
তাদের অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে, যেখানে দালাল, মালিক এবং প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ রয়েছে। নতুন নিবন্ধন বন্ধ থাকাই এই অস্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শেখ হানিফ বলেন, গত দুই দশকে ঢাকার আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়লেও সিএনজির সংখ্যা বাড়েনি। তার মতে, পুরোনো নীতির কারণে নতুন নিবন্ধনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং পুরো ব্যবস্থা এখন পুরোনো নম্বর প্লেটকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “যে নম্বর প্লেটের সরকারি মূল্য মাত্র ১২ হাজার ৪৩৯ টাকা, সেটিই নতুন নিবন্ধন বন্ধ থাকায় কালোবাজারে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
একজন অভিজ্ঞ চালক জানান, দুই যুগ আগে যারা বড় পরিসরে বিনিয়োগ করেছিলেন, তারা এখন শত কোটি টাকার মালিক। অন্যদিকে খাতটি এখন সীমিত কিছু মালিকের হাতে কেন্দ্রীভূত। তার দাবি, প্রায় ১৫ হাজার সিএনজি নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রায় এক হাজার মালিক, আর এই কাঠামোর নিচে কাজ করছেন হাজার হাজার চালক।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, নিবন্ধন ব্যবস্থার নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, সীমিত নিবন্ধন ব্যবস্থার কারণেই হাতবদলের মাধ্যমে দাম ২৫–২৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে এবং পুরো খাত একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তিনি আরও বলেন, চালকদের বৈধ নিয়োগপত্র না থাকায় এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যাত্রী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সিএনজি অটোরিকশা বাজারে ‘ব্রিফকেস সিন্ডিকেট’:
সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. বরকত উল্লাহ ভুলু বলেন, ২০০১ সালে তিনি প্রথম সিএনজি অটোরিকশা কিনেছিলেন ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই গাড়ির দাম সময়ের সঙ্গে বেড়ে এখন প্রায় ৭ লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে চাহিদা বাড়লেও সিএনজির সংখ্যা বাড়েনি। তাঁর মতে, সরকারের নীতি মূলত বড় যানবাহনের দিকে বেশি মনোযোগী। তিনি যুক্তি দেন, একটি বাসে প্রায় ৫০ জন যাত্রী বসতে পারে, আর একটি সিএনজিতে বসতে পারে তিনজন। একই জায়গায় একাধিক সিএনজি চললে জায়গার ব্যবহার বেশি হয়। এ কারণেই সরকার ছোট যানবাহনের সম্প্রসারণে আগ্রহী নয় বলে তিনি দাবি করেন।
সিএনজির দাম ২৪–২৫ লাখ টাকায় পৌঁছানোর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “মানুষের হাতে এখন অনেক অবৈধ টাকা রয়েছে। সেই টাকা বৈধ করতে অনেকে সিএনজি ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। তারাই পুরোনো সিএনজির নিবন্ধন লাখ লাখ টাকায় কিনছেন।”
তার দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে বৈধ সিএনজির সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৯৬টি। এই সীমিত সংখ্যার মধ্যেই কিছু প্রভাবশালী ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তি বিনিয়োগ করছেন, যার ফলে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য তৈরি হচ্ছে। ফলে সিএনজি আর সাধারণ চালক বা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নেই।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সিএনজি একটি ছোট খাত হওয়ায় সরকারের নজরদারি তুলনামূলকভাবে কম। ফলে এই খাতে অস্থিরতা বাড়ছে। তিনি বলেন, বিশ্ব এগিয়ে গেলেও ঢাকা এখনো পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছে। তাঁর মতে, একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও দূষণপ্রবণ শহরে খোলা যানবাহন উপযুক্ত নয়। তাই সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নত ট্যাক্সিক্যাব ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েট অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানও একই ধরনের মত দেন। তিনি বলেন, নিবন্ধন ব্যবস্থার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তাঁর মতে, এই সীমাবদ্ধতার কারণেই হাতবদলের মাধ্যমে সিএনজির দাম ২৫–২৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে এবং পুরো খাতটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু নিবন্ধন খুলে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং সড়কের সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিটি পরিবহন ব্যবস্থারই একটি সীমা থাকে। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, নিবন্ধন বন্ধ থাকলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে সিএনজি চলাচল করছে, ফলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
মহানগরীতে যুক্ত হতে পারে নতুন এক হাজার সিএনজি : বিআরটিএ
সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর অবস্থান জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর গতকাল রোববার (১২ এপ্রিল) বিকালে বলেন, ঢাকা মহানগর সম্প্রসারণ হওয়ায় ঢাকা জেলার (ঢাকা-থ) চালকরা কিছুটা বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি জানান, ওই চালকদের পক্ষ থেকে ঢাকা মেট্রো এলাকায় আরও এক হাজার সিএনজি অটোরিকশা যুক্ত করার আবেদন করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে বিআরটিএ নতুন করে এক হাজার সিএনজি অটোরিকশা নিবন্ধনের পরিকল্পনা করেছে।
তিনি আরও বলেন, “সিএনজির সংখ্যা আগে থেকেই নির্দিষ্ট করে সীমিত করা হয়েছে। এখন মূল সমস্যা হচ্ছে অটোরিকশার সংখ্যা ও ব্যবস্থাপনা। এগুলো রাস্তায় যানজট তৈরি করছে।” তার ভাষায়, চাহিদার ভিত্তিতে ঢাকা শহরে সীমিত পরিসরে কিছু নতুন সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে সিএনজির নির্ধারিত সিলিং ১৫ হাজার ৬৯৬টি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, নতুন করে এক হাজার সিএনজি অটোরিকশা যুক্ত করার একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন সরকারের ওপর নির্ভর করছে। সূত্র: ঢাকা পোস্ট

