ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও। বিশেষ করে ভিডিও কনটেন্ট থেকে ছোট অংশ কেটে ‘রিলস’ বা ‘শর্টস’ আকারে প্রচারের প্রবণতা এখন তথ্য বিকৃতির একটি বড় উৎস হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও থেকে কয়েক সেকেন্ড আলাদা করে এমনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব, যাতে মূল বক্তব্যের অর্থ পুরোপুরি বদলে যায়। এই ‘কনটেক্সট ম্যানিপুলেশন’ কেবল সামাজিক বিভ্রান্তিই তৈরি করে না, অনেক ক্ষেত্রে তা আইনি অপরাধের পর্যায়েও পড়ে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আইনি কাঠামোতে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, ডিজিটাল মাধ্যমে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা বিকৃত তথ্য ছড়ানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই নতুন কাঠামো পূর্বের ‘সাইবার সিকিউরিটি আইন ২০২৩’-এর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সাইবার নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো—ইচ্ছা (ইনটেন্ট) এবং প্রভাব (ইমপ্যাক্ট)। কেউ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিও সম্পাদনা করে এমনভাবে ছড়ায়, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, কারও সুনাম ক্ষুণ্ণ হয় বা বিচারপ্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়, তাহলে তা মানহানি, ডিজিটাল জালিয়াতি বা মিথ্যা তথ্য প্রচারের অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
বিচারাধীন বা সংবেদনশীল বিষয়ে এ ধরনের কনটেন্ট ছড়ানো আরও গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আংশিক ভিডিও অনেক সময় জনমনে ভুল ধারণা তৈরি করে, যা ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। আদালতের দৃষ্টিতে এটি বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এমন বিকৃত কনটেন্ট যাচাই করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কেবল একটি কাটা ভিডিও দিয়ে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন হয় ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, মেটাডাটা যাচাই, উৎস শনাক্তকরণ এবং সময়রেখা পুনর্গঠন। অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সঙ্গে মূল ঘটনার বাস্তবতা মিল পাওয়া যায় না।
এই পরিস্থিতিতে সচেতনতার বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো রিলস বা শর্ট ভিডিও দেখে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেওয়াই ভালো। কনটেন্টের উৎস যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি আবেগপ্রবণ হয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে, কারণ ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সাধারণত আবেগকে কেন্দ্র করেই দ্রুত ছড়ায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য শেয়ার না করা। একটি ভুল তথ্য শেয়ার করা মানেই সেটিকে আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া, যা অনেক ক্ষেত্রে আইনি দায়ও তৈরি করতে পারে।
ডিজিটাল যুগে তথ্য একদিকে যেমন শক্তিশালী হাতিয়ার, অন্যদিকে তা বিভ্রান্তির মাধ্যমও হতে পারে। তাই দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তথ্য গ্রহণের আগে যাচাই করা, প্রেক্ষাপট বোঝা এবং সচেতন আচরণ করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: তানভীর হাসান জোহা, প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

