বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া একটি লিখিত অভিযোগপত্রে, যা গত ৫ এপ্রিল সাবেক সরকারি রেল পরিদর্শক (জিআইবিআর) মো. রমজান আলী দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে তাকে মহাপরিচালক পদে পদায়ন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম, এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের মতো বিষয় রয়েছে।
অভিযোগের একটি অংশে বলা হয়েছে, পদ্মা রেলসেতু প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে পাথর সরবরাহকারী ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৩ কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়মের বিস্তৃত চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রকল্পের চুক্তির বিপরীতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। এতে বলা হয়, সাবেক রেলমন্ত্রী, তার পিএস এবং মন্ত্রণালয়ের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহযোগিতায় এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এতে আরও বলা হয়, তার পছন্দের ব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিআরএম (পাকশী), খুলনা-মোংলা পোর্ট রেলপথ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, চিফ ইঞ্জিনিয়ার (পশ্চিম), রাজশাহী এবং পদ্মা সেতু রেলপথ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নিজ পদায়নের ক্ষেত্রেও তিনি অনিয়ম করেছেন। এতে দাবি করা হয়, তিনি দ্বিতীয় গ্রেডের কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে পদ্মা সেতু রেলপথ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান, যা ঘুষের বিনিময়ে হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমান মহাপরিচালক পদে নিয়োগ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৩তম বিসিএসের মেধা তালিকায় ২২তম স্থানে থাকা সত্ত্বেও তিনি মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পান, যেখানে তালিকার শীর্ষে থাকা প্রার্থীকে অতিক্রম করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের সময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বণ্টন ও অর্থ গ্রহণের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, তার আত্মীয়-স্বজনের সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিম্নমানের কাজ করানো হয়েছে এবং বিল পরিশোধের বিনিময়ে চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণ করা হয়েছে।
রাজশাহীতে চিফ ইঞ্জিনিয়ার (পশ্চিম) থাকাকালে রেললাইনের পাথর সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, চুক্তির ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পাথর সরবরাহ করেই পুরো চুক্তির অর্থের বড় অংশ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
পদ্মা সেতু রেলপথ প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে চুক্তিমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে এমব্যাংকমেন্ট নির্মাণে ৬৭ শতাংশ পাথরের পরিবর্তে ৩০ শতাংশ ইটের খোয়া ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এসব অনিয়মের কারণে প্রায় ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকার অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়, যার মধ্যে ৯ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকার অনিয়মকে গুরুতর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খুলনা-মোংলা পোর্ট রেললাইন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে বিদেশি ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ঘুষ গ্রহণ এবং প্রকল্প ব্যয়ে কারসাজির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এসব অর্থের একটি বড় অংশ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয়েছে এবং সেখানে তার পরিবারের সদস্যরা বসবাস করছেন। একই সঙ্গে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে শত শত কোটি টাকার সম্পদ ও স্বর্ণালংকার অর্জনের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ১০০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ ক্রয়ে উন্মুক্ত দরপত্র অনুসরণ না করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে উচ্চমূল্যে ক্রয় করা হয়, যেখানে নিম্নমানের পণ্য কেনার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, পদ্মা রেলসেতু প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে কাজ ছাড়াই বা অতিরিক্ত কাজ দেখিয়ে শত শত কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, এ ধরনের অভিযোগ তার জানা নেই। অভিযোগ সত্য হলে তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই নানা অভিযোগ আসে। সব অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তথ্য-প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি সংক্ষেপে জানান, “কোনো বক্তব্য নেই”—এবং এ বিষয়ে যা খুশি লেখা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন। সূত্র: জাতীয় অর্থনীতি

