রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগ উঠছে। দেশের জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থার বড় অংশ এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় এর সিদ্ধান্ত সরাসরি জাতীয় অর্থনীতি, পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্প উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপই গুরুত্ব বহন করে।
সম্প্রতি বরাদ্দপত্রের বাইরে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্য এবং ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একাধিক দাপ্তরিক নথি, অফিস আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ব্যবস্থাকে ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, ডিজিএম (ডিএলও—অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ শফিকুর রহমানকে কেন্দ্র করে বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় অসংগতি এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ রয়েছে। মোংলা, ফতুল্লা, গুলশানসহ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ও ডিপোতে তেল বরাদ্দ ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাইপলাইন থেকে তেল গায়েব, ট্যাংকলরির ধারণক্ষমতা পরিবর্তন করে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ এবং অবৈধ মজুতের মতো বিষয়ও রয়েছে। এসব ঘটনায় কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
মোংলা ইনস্টলেশনের ঘটনায় নতুন বিতর্ক:
গত ২৯ মার্চ মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা ঘিরে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। ওই দিন মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে ডিপো প্রধানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয় এবং পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, যা সার্ভিস রুলসের একাধিক ধারা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একই রাতে যৌথ বাহিনীর একটি দল মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনের তিনটি ট্যাংকে ডিজেল পরিমাপ করে। স্টক রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেলে ১২ হাজার ৬১৩ লিটার ডিজেল অতিরিক্ত মজুত পাওয়া যায়। প্রশাসনের মতে, এটি গুরুতর অনিয়ম। এই পরিমাণ অতিরিক্ত জ্বালানির মূল্য প্রায় ১২ লাখ ১০ হাজার ৮৫০ টাকা বলে দাপ্তরিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, জেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও পুলিশের যৌথ দল ওই অভিযানে অংশ নেয়। অভিযানে ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মো. আল আমিন খানের নির্দেশনায় স্টক রেজিস্টার ও নথিপত্র যাচাই করা হয়। পরবর্তীতে মাপজোকের মাধ্যমে ট্যাংকের তেল পুনরায় পরিমাপ করে অসংগতি পাওয়া যায়।
প্রতিষ্ঠানের নথিতে বলা হয়, অভিযানের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি। পরে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং সাত কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রধান কার্যালয়ের মানবসম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়।
ব্যবস্থাপনায় নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক:
৫ এপ্রিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ডিজিএম (ডিএলও—অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ শফিকুর রহমানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
আদেশে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর এক পরিচালকের যৌথ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে তেল বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় নিয়ম না মানা এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ আনা হয়।
তবে সূত্রগুলো দাবি করেছে, প্রথমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার। কিন্তু শুরুতে শুধু দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, যা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়। পরে বিপিসি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজরে বিষয়টি গেলে নতুন করে আদেশ জারি করে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
৭ এপ্রিলের পরিদর্শনে নতুন অনিয়মের অভিযোগ:
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ৭ এপ্রিল। ওই দিন নারায়ণগঞ্জ জেলার কয়েকটি ডিপোতে তেল বরাদ্দ প্রক্রিয়া পরিদর্শনে গিয়ে একাধিক অনিয়ম ধরা পড়ে।
বেলা ১১টায় ফতুল্লা এলাকার একটি যমুনা ডিপো পরিদর্শন করে সরকারি একটি দল। তারা বরাদ্দপত্র, চালান ও হিসাবপত্র যাচাই করে বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত তেল সরবরাহের প্রমাণ পান। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে বেশি ডিজেল ও অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব অতিরিক্ত সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো লিখিত অনুমোদন পাওয়া যায়নি। বরং মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া হতো বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ডিপো ইনচার্জের বক্তব্য অনুযায়ী, বরাদ্দ অনুযায়ী তেল সরবরাহের পর প্রায়ই ফোন বা বার্তার মাধ্যমে অতিরিক্ত সরবরাহের নির্দেশ আসত। এতে বরাদ্দপত্র ও বাস্তব সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতো এবং হিসাব ব্যবস্থায় জটিলতা দেখা দিত।
একই প্রতিবেদনে বরাদ্দপত্রে স্বাক্ষর নিয়েও অনিয়মের কথা উঠে আসে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি পাতায় স্বাক্ষর থাকার কথা থাকলেও শুধুমাত্র শেষ পাতায় স্বাক্ষর পাওয়া যায়। পরে দ্রুত নতুন বরাদ্দপত্র পাঠানো হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, এসব অনিয়ম নথিপত্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয় এবং তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অফিস আদেশে সরকারি নির্দেশ অমান্য, দায়িত্বে অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সম্ভাব্য অপব্যবহারের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে অবৈধ তেল মজুতের অভিযোগে মোংলা ডিপোর ইনচার্জ আল আমীন খানকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে দাপ্তরিক সূত্র জানিয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন:
ক্রমাগত একাধিক ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে যমুনা অয়েলের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু সূত্রের দাবি, উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে তেল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম চলছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মজুত ও বাস্তব সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি এবং বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

