বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক নাড়া দেয়া ঘটনা হিসেবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (এফএসআইবি)-এর ঋণ কেলেঙ্কারি উঠে এসেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণের ৫৬ শতাংশ অংশ নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা গেছে, ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। যা ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এফএসআইবি ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০,২৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৩,৭৯১ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০০টিরও বেশি ট্রেডিং কোম্পানির কাছে। এসব কোম্পানির বেশিরভাগই ঋণ পাওয়ার যোগ্য ছিল না বলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের ১০ থেকে ২২ তারিখ পর্যন্ত ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সম্মতি বিভাগ এই তদন্ত পরিচালনা করে। এতে দেখা যায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ, জামানতের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়ানো, অনিয়মিত ঋণ পুনঃতফসিল এবং অনাদায়ী ঋণকে কাগজে-কলমে নিয়মিত দেখানোর মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম শুধু ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতিই করেনি, গ্রাহকদের আস্থা ও বিশ্বাসও হ্রাস করেছে।
এস আলম গ্রুপের ঋণ গ্রহণের ফলে এফএসআইবি ব্যাংকের ডিফল্ট ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে গেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের ডিফল্ট ঋণের পরিমাণ ১২,৯৪৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ছয়গুণ বেশি। চট্টগ্রামের ২৪টি শাখার মাধ্যমে বিতরণকৃত এই ঋণ গোষ্ঠীটির বিভিন্ন সহযোগী কোম্পানির নামে নেওয়া হয়েছে।
এস আলম গ্রুপের ঋণ গ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে এম/এস বাণিজ্য বিতান, ডিলাক্স ট্রেডিং কর্পোরেশন, ইকো ট্রেড কর্নার, গ্লোব ট্রেডার্স, ইমেজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সাপ্রিম বিজনেস সেন্টার, অর্কিড ইন্টারন্যাশনাল এবং আরও অনেক।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা বিভাগের ভূমিকা এই অনিয়মের ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। অক্টোবরে ব্যাংকটির ২৪টি শাখার ১৯৪ জন কর্মকর্তা ও ম্যানেজারকে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলীর ভূমিকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তার কাছে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। এফএসআইবি ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মান্নান দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তবে তিনিও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
এস আলম গ্রুপ ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ সাইফুল আলম দেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে। শুধু এফএসআইবি নয়, এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকেও বিপুল পরিমাণ ঋণ উত্তোলন করেছে।
এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার ভৌমিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এফএসআইবি ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে আর্থিক খাতের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি। অন্যথায় ব্যাংকিং খাতের এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

