একসময় দেশের অন্যতম সম্মানজনক রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত অগ্রণী ব্যাংক আজ আর্থিক সংকটের গভীরে নিমজ্জিত। গত পাঁচ বছরে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটেছে। যার পেছনে দায়ী রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ বিতরণ, পরিচালনা পর্ষদের অব্যবস্থাপনা এবং কোভিড-১৯-এর নেতিবাচক প্রভাব।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীকে অতিরিক্ত ঋণ প্রদান, ঋণ পুনরুদ্ধারে দুর্বল প্রচেষ্টা এবং একক ঋণগ্রহীতা সীমার বারবার লঙ্ঘন ব্যাংকটির সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এসব কারণেই ব্যাংকের আর্থিক সূচকগুলো ক্রমাগত নেতিবাচক সংকেত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংকের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। যা এর মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৯ শতাংশ। অথচ এক বছর আগে এই পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে এ পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৪.২৬ শতাংশ।
২০১৯ সালে অগ্রণী ব্যাংক মূলধন উদ্বৃত্ত অবস্থায় ছিল এবং কোনো সংরক্ষণ ঘাটতি ছিল না। তবে ২০২৪ সালে এই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। বর্তমানে ব্যাংকের সংরক্ষণ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫৯১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
একই সময়ে ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯ সালে এ পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসে দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকায়।
অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে রয়েছে নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড, ওরিয়ন গ্রুপ, বিএসআরএম গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, বেক্সিমকো লিমিটেডসহ অন্যান্য। সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদক এবং বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ঋণ সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি তাদের খেলাপি ঋণের ৪২ শতাংশের মালিক, যার পরিমাণ ২১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকের ৫৫টি বড় ঋণগ্রহীতার মধ্যে ২০টির ঋণ একক ঋণগ্রহীতা সীমা অতিক্রম করেছে।
ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বুখতিয়ার আহমেদ জানিয়েছেন, “আমরা ঋণ আদায়কে প্রথম অগ্রাধিকার দিচ্ছি। নতুন বোর্ড এবং ব্যবস্থাপনা দল ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করছে।” তবে ঋণ আদায় প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং পরিচালনাগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা ব্যাংকটির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার ওপর একটি বড় হুমকি। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।

