দেশের কোটিপতিদের চিত্তবিনোদনের জন্য অলিতে গলিতে গড়ে উঠছে নানা রকমের ক্লাব। ‘ঢাকা বোট ক্লাব’ তেমনই একটি, যেখানে ২০১৫ সালে জনপ্রতি এক লাখ টাকা দিয়ে সদস্য নেয়া শুরু হয়। ২০১৬ সালে শ্রেণিভেদে সদস্য ফি করা হয় পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা। ২০১৮-২০১৯ সালে সেই ফি হয়ে যায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। তারপর সেটি গিয়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখে। সদস্য ফি বাবদ এত টাকা নিলেও তার উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিচ্ছে না ঢাকা বোট ক্লাব।
ভ্যাট ফাঁকি দিতে ‘ঢাকা বোট ক্লাব’ অভিনব কৌশল করে সদস্য ফরমের ফি বাবদ আদায় করা অর্থকে সিএ রিপোর্টে দেখানো হয় ডোনেশন হিসেবে। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম) এর তিনটি আদেশ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট (পশ্চিম) এর ১০ ডিসেম্বরের এক আদেশে বলা হয়, ঢাকা বোট ক্লাব মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ৩০ লাখ ৩০ হাজার ৫১৮ টাকার মূসক ফাঁকি দিয়েছে। সেজন্য জরিমানা করা হয়েছে ১৫ লাখ ১৫ হাজার ২৫৯ টাকা। সুদ আরোপ করা হয়েছে ৪০ লাখ ৮৬ হাজার ২২৬ টাকা। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ অনুযায়ী ঢাকা বোট ক্লাব ২৫ কোটি ৭০ লাখ ৫৯ হাজার টাকার মূসক ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। সেজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৮ কোটি ৫৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া ক্লাবটিকে সুদ বাবদ সরকারকে আরো ৩ কোটি ৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে।
মোট ৬৮ কোটি ১৮ লাখ ৩১ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে আদেশের ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ টাকা পরিশোধ না করলে মূসক আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী প্রযোজ্য সুদ গণনা অব্যাহত থাকবে। কর ফাঁকির অভিযোগে বোট ক্লাবের বাণিজ্যিক, মূসক ও অন্যান্য দলিল পর্যালোচনা করে মূসক ফাঁকি উদঘাটন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূসক, সুদ ও জরিমানা মওকুফের আইনি সুযোগ নেই।
তবে, ভ্যাট কমিশনারেটের আদেশের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে মন্তব্য করেছেন বোট ক্লাবের সভাপতি নাসির উদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, আমাদের আইনজীবীও জানেন না। মামলা করতে হলে তো আগে নোটিশ দিতে হয়। সেটাও করা হয়নি। ক্লাবের লোকদের আচরণে ভ্যাটের লোকজন আমাদের উপর ক্ষুব্ধ। কারণ, ক্লাবের পক্ষ থেকে তাদেরকে খুশি রাখার চেষ্টা করা হয়নি। জরিমানা ও সুদের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। বকেয়া ২৬ কোটির কথা জানতাম। বেনজীর আহমেদের সময়ে এসব হয়েছে। বর্তমানে সদস্য নেয়া বন্ধ রয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০২০ থেকে ২০২১-২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত ২৫ কোটি ১ লাখ ২৭ হাজার ৮৮৭ টাকার উৎসে মূসক পাওনা হলেও তারা পরিশোধ করেননি। এছাড়া নিরীক্ষায় আরো ১ কোটি ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৭১৪ টাকার মূসক ফাঁকি উদঘাটিত হয়। পরে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তারিখে শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়। বোট ক্লাবের আবেদনের কারণে সময় বৃদ্ধি করে ১৫ অক্টোবর শুনানির দিন পুননির্ধারণ করা হয়। ওই দিন তারা লিখিত জবাব দাখিল করে তাদের আপত্তি জানান। দলিলপত্র দাখিলের জন্য আরো ৬০ দিন বৃদ্ধির আবেদন জানান। তাদেরকে যৌক্তিক সময় দেয়া হয় এবং তাদের জবাব পর্যালোচনার জন্য কমিটি করা হয়। তারা ওই সময়ের মধ্যে দলিলপত্র দাখিল করতে না পেরে পুনরায় সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেন। তারপর গত ২৫ নভেম্বর শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়। ওই দিন বোট ক্লাব কর্তৃপক্ষ শুনানিতে উপস্থিত হয়নি এবং কোনো প্রমাণও দাখিল করতে পারেনি। ভ্যাটের পর্যালোচনা কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেন। বারবার সময় নিয়েও প্রমাণ উপস্থাপন না করা ও শুনানিতে উপস্থিত না হওয়াকে ইচ্ছাকৃত মূসক ফাঁকি হিসেবে দেখছে ভ্যাট বিভাগ।
আদেশে আরো বলা হয়, ডোনেশনের নামে অব্যাহতি পাওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য। সদস্য ফরমের মাধ্যমে যে ফি আদায় করা হয়, সেটা ফরমে ফি হিসেবেই উল্লেখ আছে, ফেরতের কোনো বিষয় উল্লেখ নেই। বিনিময় দলিল অনুযায়ী এটা ফি। সিএ রিপোর্টে এটাকে ডোনেশন নামে উল্লেখ করা হলেও এটা ডোনেশন নয়। বরং এটা বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডের আলোকে একটা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব সংরক্ষণের গ্রুপ হেড মাত্র। এটা ভ্যাটের জন্য সহায়ক হলেও ভ্যাটের জন্য মূল প্রমাণ সদস্য ফরম। তাছাড়া ডোনেশন অফেরতযোগ্য এবং কোনো কিছুর বিনিময়ে হয় না। কিন্তু, সদস্য ফরমে বিনিময় হয়েছে এবং বিনিময়ে সদস্য পদের স্বত্ব বা অধিকার তৈরি হয়েছে। তাই ডোনেশন এর দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাকৃত ফাঁকি প্রমাণিত। একইসঙ্গে তাদের ইচ্ছাকৃত সময়ক্ষেপণও প্রমাণিত।
ফাঁকি দেয়া ভ্যাট না দিতে তারা লিখিত বক্তব্যে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। ভ্যাট বিভাগও তাদের আইনের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে।
আদেশে বলা হয়, সদস্য পদের বিপরীতে সদস্যদের থেকে নেয়া ফেরতযোগ্য এককালীন অর্থকে বোট ক্লাব র্কতৃপক্ষ অফেরতযোগ্য ডোনেশন হিসাবে দাবি করেছে, যা স্ববিরোধী। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ অনুযায়ী সদস্য ফি সর্বোচ্চ দশ হাজার টাকা পর্যন্ত, এমন সামাজিক ক্লাবকে মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বোট ক্লাবের সদস্য ফি সর্বনিম্ন ২৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া বিশেষ করে প্রজ্ঞাপন দিয়েও এ ক্লাবকে মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়নি। সেই হিসেবেও তাদের বক্তব্য আমলে নেয়ার সুযোগ নেই।

