দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আরামিট পিএলসি বর্তমানে আর্থিক সংকটে রয়েছে। কোম্পানিটির নগদ টাকার প্রবাহ ঋণাত্মক হওয়ায়, এটি এক কোটি ৭১ লাখ ৩২ হাজার টাকার অবণ্টিত লভ্যাংশ সিএমএসএফ তহবিলে জমা দিতে পারছে না। যা সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানিটি শ্রম আইন এবং সম্পদ ভ্যালুয়েশনের নিয়মগুলোও অনুসরণ করেনি। ২০২৩-২৪ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। এমনকি আরামিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুখমিলা জামান ও তার স্বামী সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম চালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি’র নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি কোম্পানির অবণ্টিত লভ্যাংশ সিএমএসএফ তহবিলে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তবে আরামিট তা করতে পারেনি। কোম্পানির সেক্রেটারি সৈয়দ কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, টাকার অভাবে তারা অবণ্টিত লভ্যাংশ জমা দিতে পারেননি। তবে শ্রমিকরা তাদের সংশ্লিষ্ট তহবিল থেকে পাঁচ শতাংশ টাকা পেয়েছেন।
আরামিটের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় রুখমিলা জামান চৌধুরী রয়েছেন। যিনি একসময় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) এর চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাকে ইউসিবি থেকে সরিয়ে দেয় এবং ব্যাংকটিতে নতুন বোর্ড গঠন করে। এদিকে আরামিটের মোট দায় রয়েছে ৩১ কোটি ২৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। আর মোট সম্পদের পরিমাণ ১১২ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পুঁজিবাজারে কোম্পানিটি ৬০ লাখ শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে ৬০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। তবে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ ও তার পরিবারের লুটপাটের কারণে শেয়ারদর গত এক বছরে অর্ধেকে নেমে গেছে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ জানিয়েছেন, আরামিটের মালিকরা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন এবং তারা ইউসিবি থেকেও ব্যাপক অর্থ লুট করেছেন, যা বিদেশে পাচার হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আরামিটের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী নন। রুখমিলা জামান ইউসিবির চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায়ও ব্যাংকের শেয়ারদর ব্যাপক পতন ঘটেছে, যা কোম্পানির পরিচালনার অনিয়মকে ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে যে, রুখমিলা জামান ও তার স্বামী সাইফুজ্জামান চৌধুরী মিলেই ইউসিবির টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছেন।
এদিকে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে পুলিশ। সিআইডি জানায়, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তিনি ৪৮ লাখ ডলার বা প্রায় ৫৭২৪ কোটি টাকার সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করেছেন। এছাড়া ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে তিনি ও তার স্ত্রী রুখমিলা জামান যৌথভাবে ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান খোলেন, যার মূল্য প্রায় ২১ কোটি ৭২ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কোম্পানির মুনাফা থেকে শ্রমিকদের জন্য ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন এবং শ্রমিকদের মধ্যে তা বিতরণের নিয়ম রয়েছে কিন্তু আরামিট কর্তৃপক্ষ তা করেনি। বর্তমানে ১৫ লাখ ৪ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়নি। একইভাবে, কোম্পানিটি কর্মচারী গ্র্যাচুইটি তহবিলও বজায় রাখেনি, যা আন্তর্জাতিক হিসাবনীতির নিয়মের বিপরীতে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম জানিয়েছেন, কোম্পানির প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর এসব সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে এবং তদন্তে আরো আইন লঙ্ঘন পেলে কমিশন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে তিনি মনে করেন, জনবল সংকটের কারণে এই প্রক্রিয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
এদিকে আরামিট সামান্য মুনাফায় ফিরেছে, তবে কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত কোম্পানির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৪৪ পয়সা, যা আগের বছরে ছিল ঋণাত্মক ৩৯ পয়সা। তবে গত এক বছরে শেয়ারদর প্রায় ৩৭ শতাংশ কমে ১৬১ টাকা ৭০ পয়সায় নেমে গেছে। এক বছর আগে কোম্পানির শেয়ারদর ছিল ২৫৮ টাকা ৯০ পয়সা। কোম্পানিটির শেয়ারদরের এমন পতন বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে।
আরামিট পিএলসি ১৯৮৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটেগরিতে অবস্থান করছে। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ৬০ দশমিক ৭৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দখলে রয়েছে ১৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ২৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ শেয়ার।

