খুলনার কয়রা-বেতগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত ৩৭৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকার কাজ দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাবে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দুই বছরের জন্য পরিকল্পিত এ প্রকল্প সাড়ে চার বছরেও সম্পূর্ণ হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এ প্রকল্প কেবল অর্থ অপচয়েই সীমাবদ্ধ থাকায় জনগণকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ সঠিকভাবে কাজে না লাগানোর ফলে সড়কজুড়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সোজা করার কথা থাকলেও তা সম্পূর্ণ হয়নি। ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের বেশিরভাগ কাজই হয়েছে নিম্নমানের। কোথাও কার্পেটিংয়ের উপর আবার নতুন কার্পেটিং করা হয়েছে, যা অল্প সময়েই ফাটল ধরেছে। ফলে এলাকাবাসীকে জীবন হাতে নিয়ে এ সড়কে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ জানিয়েছে, সাতক্ষীরার তালা উপজেলা থেকে ডুমুরিয়ার বেতগ্রাম পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার সড়কটি খুলনা-সাতক্ষীরা আঞ্চলিক মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রকল্পে সড়ক প্রশস্তকরণ, ৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সরলীকরণ, কালভার্ট নির্মাণ, নদী শাসন এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পাঁচটি প্যাকেজে কাজ ভাগ করা হয়েছিল।
তবে প্রকল্পের বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজ নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরুর পর ২০২২ সালের জুনে শেষ করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর প্রকল্পের সময় দুইবার বাড়ানো হয়, সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু এত সময় পেয়েও প্রকল্পের কাজ ৬৪.৫০ শতাংশের বেশি অগ্রগতি দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং উন্নয়ন কর্মীদের অভিযোগ, মোজাহার এন্টারপ্রাইজ প্রকল্প থেকে ১৭৮ কোটি টাকা নিয়ে কাজ ফেলে রেখেছে। কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধার দাবি, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শেখ হেলাল উদ্দীনের ঘনিষ্ঠ এই প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে কাজ না করেই অর্থ তুলে নিয়েছে।
এ বিষয়ে মোজাহার এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি হুমায়ূন কবির বলেন, জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কারণে কাজের সময়ক্ষেপণ হয়েছে। তিনি দাবি করেন, প্রকল্পের কাজ করে তারা অর্থ নিয়েছেন, তবে অতিরিক্ত টাকা নেননি। আর্থিক ক্ষতির মুখে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
কয়রা সদর থেকে দেয়াড়া, দক্ষিণ নলতা, খলিলনগর, গোনালী, মালোপাড়া এবং মেলাবাজারের মতো এলাকাগুলোতে রাস্তার কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে পিচ ঢালাই দেবে গেছে, আর দুই পাশের গাইড ওয়াল মাটির চাপ সহ্য করতে না পেরে বেঁকে গেছে। বাস চালক সেলিম হোসেন বলেন, “এখন সড়কজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি আর খানাখন্দ। আগে এই সড়কে যাতায়াত সহজ ছিল কিন্তু এখন প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শঙ্কায় চলতে হচ্ছে।”
সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সাগর সৈকত জানান, পাঁচটি প্যাকেজের মধ্যে তিনটি প্যাকেজের কাজ আংশিক সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যথাযথ যাচাই ছাড়া অর্থ ছাড়ের সুপারিশ করেছিলেন বলে তিনি মনে করেন। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন পরিকল্পনা ও নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা চান, সড়কটি দ্রুত মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করা হোক। এ ছাড়া তারা প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে সঠিক তদন্ত দাবি করেছেন। সঠিক তদারকির অভাব এবং দুর্নীতির কারণে এমন প্রকল্পগুলো জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এ সড়কের কাজ সম্পন্ন করা, যাতে জনগণের অর্থ ও সময়ের অপচয় রোধ করা যায়।

