যশোরের মনিরামপুরে পল্লীবিদ্যুতের লাইন নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় দুই কোটি টাকার সরঞ্জাম আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। নির্ধারিত কাজের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও এসব সরঞ্জাম যশোর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এ প্রকল্পে জড়িত ছিলেন মনিরামপুরের কাজী মনিরুজ্জামান। স্থানীয় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মনিরুজ্জামান আগে হোটেল কর্মচারী ও পল্লীবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। যুবলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার পর তাঁর আর্থিক অবস্থার নাটকীয় উন্নতি ঘটে।
তথ্যমতে, আওয়ামী লীগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের ভাগনে এবং উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক উত্তম চক্রবর্তী বাচ্চুর ছত্রছায়ায় থেকে মনিরুজ্জামান পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। পরে তিনি মেসার্স মুবিন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করেন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে যশোর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ থেকে লাইন নির্মাণের কাজ পান। তাঁর পাশাপাশি মাগুরার আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, চুয়াডাঙ্গার মেসার্স মারিয়ান এন্টারপ্রাইজ ও ঢাকার মেসার্স এমবি পাওয়ারও কার্যাদেশ পায়।
২০২২ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার সরঞ্জাম বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে কার্যাদেশ অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার নিয়ম থাকলেও দুই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও কাজ সম্পন্ন হয়নি।
তদন্তে জানা যায়, তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাজের দায়িত্ব কার্যত মনিরুজ্জামানের হাতে ছিল। তাঁর সঙ্গে সরঞ্জাম উত্তোলন ও আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন সাইফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান টুটুল। প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকার সরঞ্জাম এখনও জমা দেওয়া হয়নি।
মেসার্স মারিয়ান এন্টারপ্রাইজ, এমবি পাওয়ার ও আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিকরা দাবি করেন, তাঁরা মনিরুজ্জামান ও তাঁর সহযোগীদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। মারিয়ান এন্টারপ্রাইজের মালিক হাবিবুর রহমান বলেন, “আমার লাইসেন্সে মনিরুজ্জামান সরঞ্জাম উত্তোলন করেছেন। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।”
মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক হাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, সরঞ্জাম ফেরত দিতে বললে মনিরুজ্জামান ও তাঁর সহযোগীরা হুমকি দেন। মেহেদী হাসান টুটুল অভিযোগ করেন, জোর করে তাঁর সই নিয়ে সরঞ্জাম উত্তোলন করা হয়েছে।
কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, তিনটি লাইসেন্সের বিপরীতে নেওয়া ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকার সরঞ্জাম শিগগিরই ফেরত দেওয়া হবে। তবে অন্যান্য বিষয়ে মন্তব্য করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
যশোর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জেনারেল ম্যানেজার আবদুল লতিফ জানান, আরইবির তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা মিলেছে। তিনি বলেন, “আমরা মনিরুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছি। আশা করছি, দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনায় বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

