বিগত কয়েক মাস ধরে রেমিট্যান্সের ডলারের বিনিময় মূল্য ১২১-১২২ টাকায় স্থিতিশীল থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা হঠাৎ করেই বেড়ে ১২৭-১২৮ টাকায় পৌঁছেছে। এই পরিবর্তন অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক ইঙ্গিত বহন করে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচেষ্টা এতে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো ডলারের চাহিদা বৃদ্ধির যুক্তি দেখালেও এই উল্লম্ফন বিদেশে পুঁজি পাচারের পুনর্জাগরণের আভাস দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে, পুঁজি পাচার প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার জন্য।
একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, গত ১৫ বছরে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। ব্যাংকিং, জ্বালানি, ভৌত অবকাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতগুলো এই লুটপাটের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল। এই বিপুল অর্থের বড় অংশ পাচার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর এবং ট্যাক্স হেভেনগুলোতে।
রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি লুটপাটতন্ত্র দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে। নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি এদের সহযোগিতায় বহুগুণ বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগ দুর্বল হয়ে পড়েছে, রিজার্ভ হ্রাস পেয়েছে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নির্দেশ জারি করেছে যে ডলারপ্রতি ১২৩ টাকার বেশি দামে লেনদেন করা যাবে না। তবে, ডলারের দাম পুরোপুরি বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা ঝুঁকিপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রার বাজার সহজেই হুন্ডিওয়ালাদের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
বর্তমানে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবাহ, রপ্তানির প্রবৃদ্ধি এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় সহায়ক হয়েছে। তবে, ডলারের দামের অস্থিরতা এ অগ্রগতি বিপন্ন করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ডলারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। এক্সচেঞ্জ হাউস ও ব্যাংকগুলো যদি নিয়ম ভঙ্গ করে, তবে জরিমানা ছাড়াও কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি হুন্ডিওয়ালাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে সরকারের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান সরকারের জন্য প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত:
– রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা।
– বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ উৎসাহিত করা।
– ডলারের বাজারে হুন্ডিওয়ালাদের প্রভাব মোকাবিলা করা।
– আমদানি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ়তা বজায় রাখা।
অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। তা না হলে, আসন্ন রমজানসহ ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

