ধান সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ২০২১ সালে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। এই লক্ষ্যে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রথম ধাপে ৩০টি সাইলো নির্মাণের কথা থাকলেও, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও কোনো কাজই শুরু হয়নি। ফলে বাস্তবসম্মত না হওয়ায় কাজ শুরু না করেই প্রকল্পটি সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
প্রকল্পটি তিন বছর ধরে চললেও নির্মাণের কোনো কাজই হয়নি। বরং সময়ের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ কিংবা প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরুর বদলে পরামর্শক সংস্থার কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ এবং কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সুবিধার জন্য অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার অপচয় হয়েছে। যার মধ্যে পরামর্শকের জন্য ৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, যানবাহন খাতে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং কর্মকর্তাদের বেতন ও ভাতা বাবদ খরচ হয়েছে ৮০ লাখ টাকা।
পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই উদ্যোগটি ২০২১ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত মেয়াদে কাজ না হওয়ায় প্রথমবার প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয় এবং বাজেট বাড়ানো হয় ১৬ লাখ টাকা। কিন্তু বর্ধিত মেয়াদেও কাজ না হওয়ায় আরও দুই বছর মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। তবে পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় প্রকল্পটি সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরপর খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত করার জন্য প্রস্তাব দেয়। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় থেকে ১ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা কমিয়ে ৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা ধরা হয়।
প্রকল্প পরিচালক মো. শহীদুল আলম জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নতুন হওয়ায় এবং পরামর্শক সংস্থা নিয়োগে বিলম্ব হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেছেন, “প্রকল্প নেওয়ার সময় যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। তবে এটি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার চেয়ে সমাপ্ত করা ভালো হয়েছে।”
পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশীদ এই বিষয়ে বলেন, “মন্ত্রণালয়গুলোয় প্রকল্প নেওয়ার জন্য এক ধরনের প্রতিযোগিতা থাকে। এতে সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রকল্প নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা সমস্যা তৈরি হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়ার আগে জায়গা চিহ্নিত করার মতো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে প্রকল্প নেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এমন অপচয়ের প্রবণতা বন্ধ হবে না।”
সাইলো নির্মাণ প্রকল্পের এই ব্যর্থতা কেবল অর্থ অপচয়ের উদাহরণ নয় বরং সরকারি পরিকল্পনার দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবের প্রতিফলন। এর সমাধানে ভবিষ্যতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষি খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

