আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেড ৩ হাজার ৬৩৫ মেট্রিক টন র সুগার (অপরিশোধিত চিনি) আমদানি করেছে চারটি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে। বন্ড কর্মকর্তাদের না জানিয়ে গোপনে ওই চিনি অবৈধভাবে সরিয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ১৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেড।
আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটিকে শুল্ককর পরিশোধে দাবিনামা জারি করেছে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, আব্দুল মোনেম গ্রুপের এ প্রতিষ্ঠানটির বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও অনিয়ম কোনোভাবেই থামছে না। এর আগে বহুবার প্রতিষ্ঠানটি অপরিশোধিত চিনি অবৈধভাবে অপসারণ করে বিপুল পরিমাণ শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্রমতে জানা যায়, আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেড হোম-কনজাম্পশন বন্ডভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। কাস্টমস আইন অনুযায়ী, হোম-কনজাম্পশনভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমদানিকালে শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াই অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে বন্ড রেজিস্টারে ইন্টু-বন্ড করে বন্ডেড ওয়্যারহাউসে গুদামজাত করা হয়। এই অপরিশোধিত চিনির বন্ডিং মেয়াদ ছয় মাস। বন্ডেড লাইসেন্স প্রদানের শর্তানুযায়ী এক্স-বন্ড ডিক্লারেশন করে আইন অনুযায়ী বন্ড সুবিধায় আমদানি করা অপরিশোধিত চিনির প্রযোজ্য শুল্ককর পরিশোধ করে দেশীয় ভোগের জন্য খালাস নেয়া হয়।
সূত্রমতে আরো জানা যায়, আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেড বন্ড সুবিধায় আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি অবৈধভাবে অপসারণ করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ পায় বন্ড কমিশনারেট। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর কমিশনারেটের একটি প্রতিনিধিদল প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সহায়তায় ওয়্যারহাউসে মজুত কাঁচামাল বা অপরিশোধিত চিনি ইনভেন্টি করা হয়। এতে দেখা যায়, ওয়্যারহাউসে কোনো র সুগার বা কাঁচামাল নেই। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা ওই সময় একটি বিবৃতিও দিয়েছেন।
হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ৩১ জুলাই ও ২০ আগস্ট মোট ৩ হাজার ৬৩৫ মেট্রিক টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে। যার শুল্কায়ন যোগ্য মূল্য ২৭ কোটি ৪২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬০ টাকা। যার মধ্যে প্রযোজ্য শুল্ককর ১৪ কোটি ৮২ লাখ ৯২ হাজার ৪০১ টাকা (কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, ভ্যাট ও এআইটি)। মূলত প্রতিষ্ঠানটি অবৈধ অপসারণের মাধ্যমে এই ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে, যা কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ১২৬ ধারা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে আদায়যোগ্য। সূত্রমতে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, বন্ড লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করা এবং প্রযোজ্য শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানকে ২৩ অক্টোবর দাবিনামা ও কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ২৯ ডিসেম্বর প্রথম শুনানি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার শুনানি ছিল। প্রতিষ্ঠান শুনানির জন্য আবার সময় চেয়েছে।
এ বিষয়ে আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের হেড অব কমার্শিয়াল আজিজুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয়েছে।তিনি বলেন, আমরা বিক্রি করে দিয়েছি এটা সত্যি। তবে আমরা চিন্তা করছি বিচারাদেশ হওয়ার আগেই এই শুল্ককর দিয়ে দেব।
বন্ড কমিশনারেটের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটি কাঁচামাল আমদানি করে অনেক সময় কাঁচামাল বিক্রি করে দেয়, অনেক সময় চিনি উৎপাদন করে বিক্রি করে দিচ্ছে। এর আগে একাধিকবার প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত চিনি বিক্রি করে দিয়েছে। প্রমাণিত হওয়ায় অর্থদণ্ডও দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান কিছু শুল্ককর দিয়েছে। আবার উচ্চ আদালতে রিট করেছে, যা বিচারাধীন রয়েছে।
অপরদিকে, একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেড চট্টগ্রামভিত্তিক একটি গ্রুপ অব কোম্পানির কাছে গোপনে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিক্রির বিষয় অনেক দূর এগিয়েছে। তবে এই বিষয়ে বন্ড কমিশনারেটকে কিছুই জানানো হয়নি। বর্তমানে বন্ড কমিশনারেট আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের কাছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বকেয়া রয়েছে।
বন্ড কমিশনারেটের হিসাব অনুযায়ী, উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলায় ৫০৪ কোটি ৩১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৭৪ টাকা শুল্ককর জড়িত রয়েছে। এছাড়া দুটি বিচারাদেশের ৬৭৪ কোটি ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার ৯৫৫ টাকা রাজস্ব উদ্ভব হয়েছে। প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দও করা হয়েছে। পরে আদালতের নির্দেশে তা খুলে দেয়া হয়েছে। আদালতের রায় অনুযায়ী ১৪ মে প্রতিষ্ঠানটি ৬৭ কোটি ৯৫ লাখ ৩ হাজার ৮৯০ টাকা, ২৭ জুন পর্যন্ত প্রথম কিস্তির ১০১ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ১৪৪ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তির ১০১ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ১৪৪ টাকা জমা দেয়ার কথা থাকলেও গত জুলাই মাসে মাত্র ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৬ টাকা জমা দিয়েছে। বর্তমানে দুটি বিচারাদেশের হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৫০৪ কোটি ৩১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৭৪ টাকা শুল্ককর পাওনা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির আমদানির হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত চারটি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে বিদেশ থেকে বন্ড সুবিধায় ৩ হাজার ৬৩৫ মেট্রিক টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে। কিন্তু ২ অক্টোবর বন্ড কর্মকর্তারা বন্ডেড ওয়্যারহাউজে কোনো র সুগার মজুত পায়নি। ওই অপরিশোধিত চিনি কোথায় বা কীভাবে বিক্রি করা হয়েছে এই বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
বন্ড কর্মকর্তাদের ধারণা, শুল্ককর ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি এই বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত চিনি অবৈধভাবে অপসারণ করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে, যা কাস্টমস আইন ও বন্ড লাইসেন্সের শর্ত বিরোধী।

