গত সাড়ে ১৫ বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ লুটপাটের ঘটনা ঘটে। যার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার (এসকে) সুর চৌধুরী। একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির নায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। যা দেশের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এমন নীতিমালা প্রণয়ন করেন। যা লুটপাটের সুযোগ তৈরি করেছিল।
এসকে সুর চৌধুরী ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা। যিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংক খাতের দুর্নীতির প্রবণতা বাড়ানোর জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেছেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্তিশালী পরিদর্শন ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দিয়েছিলেন। ব্যাংক খাতের ধ্বংসের পেছনে তার অবদান অপরিসীম। তিনি একাধিক ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদের অপরাধকে আড়াল করতে সহায়তা করেন। এসব দুর্নীতির মধ্যে এস আলম গ্রুপ, নূরজাহান গ্রুপ এবং ইমাম গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এসকে সুর চৌধুরী শুধু ব্যাংক খাতেই নয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পিকে হালদারের দুর্নীতির সহায়ক ছিলেন। পিকে হালদার এবং তার সহযোগীরা একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করে সেগুলোর শেয়ার নাম-বেনামে কিনে লুটপাট করেছিল। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং রিলায়েন্স ফাইন্যান্স উল্লেখযোগ্য। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পিকে হালদার এবং তার সঙ্গীরা প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা লুট করেন। সুর চৌধুরী এসব ঘটনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলেও, নীরব ভূমিকা পালন করে একে সম্ভব করে তোলেন।
২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে এসকে সুর চৌধুরী বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদে নিযুক্ত হন। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার পর তার হাত ধরেই ব্যাংক খাতে একটি নজিরবিহীন ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে, যা হলমার্ক কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত। এর পরেই বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসে। যেখানে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কোনো ধরনের আইন-কানুন প্রয়োগ করা হয়নি। যা ব্যাংক খাতে দুর্নীতির গতিপথকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
এসকে সুর চৌধুরী তার পদক্ষেপগুলোতে সবসময় রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেয়েছিলেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়, তার পদে থাকা সত্ত্বেও বহু অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার ইচ্ছা অনুসারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত হতো এবং প্রভাবশালীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকে তিনি নিজের সুবিধা আদায় করতেন। ব্যাংক খাতের জন্য তিনি এমন নীতিমালা প্রণয়ন করেন, যার মাধ্যমে ঋণখেলাপিরা ২ শতাংশ সুদে ঋণ নবায়ন করতে সক্ষম হয়। যা ব্যাংক খাতের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।
এসকে সুর চৌধুরী ২০১৮ সালে অবসরে গেলেও তার দুর্নীতি থেমে থাকেনি। ২০১৫ সালের পর, রাজনৈতিক চাপের ফলে তাকে ব্যাংক সংস্কার উপদেষ্টা হিসাবে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি একাধিক দুর্নীতির ঘটনায় সহায়তা করার পাশাপাশি, নিজের জন্য বিপুল অর্থসম্পদও তৈরি করেছিলেন। যা বিদেশে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পিকে হালদারের দুর্নীতি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।
এসকে সুর চৌধুরী তার অপকর্মের পরিণতিতে, সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারের পর তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলখানায় পাঠানো হয়েছে। তার গ্রেফতারের ঘটনায় বর্তমান এবং সাবেক ব্যাংকাররা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কারণ তারা জানাচ্ছেন, তার আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল দুর্নীতির এক কেন্দ্রস্থল, যেখানে একের পর এক অপরাধ সংঘটিত হতো।

