গত বছরের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠিত হয়। তবে এসব পরিবর্তনের পরও ব্যাংকটির ঋণ বিতরণে নতুন অনিয়মের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে। বিশেষকরে ব্যাংকটির স্বতন্ত্র পরিচালক ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মো. আবদুল জলিলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের পাঁচ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। তবে ২০২৩ সালের ১০ ডিসেম্বর ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটি ট্রু ফেব্রিক্স লিমিটেডের জন্য ২১০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল এবং নতুন করে ৪০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে, যা অনুমোদন ছাড়াই করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, এই ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় ব্যাংকিং নিয়ম ভঙ্গ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল জলিলের ভূমিকা সরাসরি দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে আসে, আবদুল জলিল ছয় বছরের বেশি সময় ধরে ট্রু ফেব্রিক্স লিমিটেড এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনিফিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডে আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কাজ করার সময়ই ঋণ পুনঃতফসিল ও নতুন ঋণ অনুমোদনে ভূমিকা রেখেছেন।
এ ছাড়া তদন্তে আরও জানা গেছে যে ট্রু ফেব্রিক্স লিমিটেডকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্টের নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির পণ্য সরেজমিনে পরিদর্শন কিংবা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার বিশ্লেষণ ছাড়াই ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রু ফেব্রিক্স লিমিটেডের ঋণ সীমা লঙ্ঘন করে ১০ কোটি ১৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে আবদুল জলিলের জন্য কক্ষ বরাদ্দ দেওয়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আবদুল জলিল তার এক আত্মীয়কে ইসলামী ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিয়েছেন, যা ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী।
২০২৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ব্যাংকটি ট্রু ফেব্রিক্স লিমিটেডের ঋণ পুনঃতফসিল ও ঋণ অনুমোদন বাতিল করে। তবে ১০ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ঋণের টাকা তোলার সুযোগ দেওয়া হয়, যা মারাত্মক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল মাওলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও, তারা ফোন ধরেননি।
অন্যদিকে, আবদুল জলিল জানিয়েছেন, ঋণ অনুমোদনে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং এটি পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ছিল। তার ভাষ্য, “ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম আছে। এটি পুরোনো গ্রাহক। আমরা বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে আসা এ ধরনের অনিয়ম দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগজনক। যথাযথ আইনি ব্যবস্থা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা না গেলে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হতে পারে।

