রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে বিগত সরকারের আমলে। এননটেক্স গ্রুপের ২২ প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকটির ঋণ জালিয়াতি ৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। এ জালিয়াতিতে সরাসরি সহায়তা করেন তখনকার জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুছ ছালাম আজাদ। জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক পদে থাকার সময় আবদুছ ছালাম আজাদ আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গ্রুপটির ঋণের অনুমোদন, বিতরণ ও পরিবীক্ষণে সহায়তা করেছেন।
২০২২ সালে এসব ঋণ অনিয়ম তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানায়, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ না পাওয়ায়, দুদক অভিযোগের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেছে। তবে দেশেরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এননটেক্সের ঋণ অনিয়ম ধরতে পুরোনো ফাইল নিয়ে আবারও মাঠে নেমেছে দুদক। আর এক্ষেত্রে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
২০২২ সালে দুদক আরেকটি চিঠিতে বলেছিল, এননটেক্স গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জামানত প্রদান না করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় শত শত কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে আত্মসাৎ সংক্রান্ত যে অভিযোগ করা হয়েছিল তা দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে প্রমাণ হয়নি। তবে এখন আবার সেই একই অভিযোগে তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছে দুদক।
সূত্র জানিয়েছে, জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এননটেক্স গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া ঋণের অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়ে তদন্ত করছে দুদক। অনুসন্ধানের স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য জানতে চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ব্যাংককে পাঠানো চিঠিতে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, জনতা ব্যাংক পিএলসির জনতা ভবন করপোরেট শাখার গ্রাহক সুপ্রভ স্পিনিং লিমিটেডের অনুকূলে ২০ শতাংশ মার্জিনে ১৮০ কোটি টাকা এবং ১০ শতাংশ মার্জিনে ১৫০ কোটি টাকার এলসি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্মারক নং- ডিওএস (এল) ১১৫২/৩ (০৩)/২০১৩-৪২০ তারিখ ১৮-১১-২০১৩ খ্রি. মূলে এমওইউ এ নির্দেশিত একক গ্রাহকের ঋণ সীমা (১৫ শতাংশ)- এর শর্ত শিথলপূর্বক বিশেষ বিবেচনায় অনাপত্তি প্রদান করা সংশ্লিষ্ট নথির সত্যায়িত ছায়ালিপি নোটাংশসহ (ব্যাংক-গ্রাহকের আবেদন বা প্রপোজাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পর্যন্ত)।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ব্যাংক খাতের অনিয়মের বিষয়গুলো এত দিন লুকানো ছিল। তখন রাজনৈতিক চাপ ছিল, তবে এখন আগের মতো কোনো কিছুর চাপ নেই। স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ফলে বিশেষ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা বের হয়ে আসবে। এছাড়া অনিয়মে জড়িতদের সঠিক বিচার হওয়া বলেও তিনি মনে করছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জনতায় এননটেক্সের ঋণ অনিয়ম ব্যাপক আলোচিত একটি ঋণ কেলেঙ্কারি। ব্যাংকটির তখনকার এমডিসহ বেশ কিছু কর্মকর্তা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন ব্যাংকে স্বাধীনভাবে পরিদর্শন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের অন্য কয়েকটি সংস্থাও এ বিষয়ে কাজ করছে। এতে অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা ও নামে-বেনামে ঋণ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো ধরা পড়বে বলে আশা প্রকাশ করছেন তারা।
বিভিন্ন সময়ে জনতা ব্যাংকে বড় ধরনের ঋণ অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। তাতে খেলাপি হয়ে পড়েছে এসব ঋণ। বারবার পুনঃতফসিল করার পরও এসব ঋণ আদায় হচ্ছে না। পুরো ব্যাংক খাতের সার্বিক খেলাপি ঋণ যেখানে ২০ শতাংশের কম, সেখানে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ৩ গুণ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অ্যাননটেক্স গ্রুপসহ জনতা ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ রয়েছে ৬০ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের যা ৬৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো হেলাল আহম্মেদ জনি বলেন, আমাদের দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আছে। ঋণ নিয়ে অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও অনিয়মকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এটি করতে পারলে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে মনে করি।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন রিপোর্টে ওঠে এসেছে, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া কোম্পানি খুলে জনতা ব্যাংক থেকে এলসির (ঋণপত্র) টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এননটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনুস বাদল। তিনি ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা বের করে নেন। ওই টাকার মধ্যে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে তিনি একটি ‘ডামি ফ্যাক্টরি’ করেন। বাকি টাকা দেশের বাইরে পাচার করে দেন। একটি দেশে তিনি ‘সিসার’ বারও দেন। ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে তার বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি প্রচার করেন। আসলে তিনি বেশির ভাগ অর্থ পাচার করে দিয়েছেন।

