দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের পোল্ট্রি খাতে শীর্ষস্থান ধরে রাখা প্রতিষ্ঠান প্রভিটা গ্রুপ আজ ঋণখেলাপি ও আইনি জটিলতায় জর্জরিত। ২০০১ সালে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি পোল্ট্রি ফিড ব্যবসায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। নুরুন্নবী ভূঁইয়ার নেতৃত্বে প্রভিটা দ্রুতই ব্যবসা সম্প্রসারণ করে পোল্ট্রি ফিড, ফিশ ফিড, হ্যাচারি, ডে-ওল্ড চিকেন, লেয়ার চিকেনসহ বিভিন্ন খাতে। একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিলাসবহুল প্রকল্প গড়ে তোলে তারা।
তবে কোভিড-১৯ মহামারিতে প্রভিটা গ্রুপ বড় ধরনের ধাক্কা খায়। মহামারির সময় মুরগির চাহিদা ব্যাপক হারে কমে যায়, যার ফলে একদিনের বাচ্চা বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। লোকসানের চাপে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সংকটে পড়ে। এরপর থেকে ব্যবসার পুরনো অবস্থায় ফিরতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বর্তমানে প্রভিটা গ্রুপের ওপর প্রায় ৩৩০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। ২০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। ব্যাংক এশিয়া, ইউসিবিএল, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের অর্থ প্রভিটার কাছে আটকে আছে।
ব্যাংক এশিয়ার খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক সুবির পাল জানান, প্রভিটা গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠান-প্রভিটা ফিড, প্রভিটা ব্রিডার্স, প্রভিটা চিকস এবং প্রভিটা হ্যাচারি- এর নামে ১৭৩ কোটি টাকার ঋণ বকেয়া রয়েছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বন্ধক রাখা ৪ হাজার শতক জমির বর্তমান বাজার মূল্য মাত্র ৮৮ কোটি টাকা, যা ঋণের তুলনায় খুবই নগণ্য।
ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. জামাল উদ্দিন জানান, প্রভিটা গ্রুপের এবিএইচ করপোরেশনের কাছে ১০০ কোটি টাকা ঋণ বকেয়া রয়েছে। ঋণ পুনর্গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও ডাউন পেমেন্ট না দেয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অর্থঋণ মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
ওয়ান ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রভিটার কাছে কারওয়ান বাজার শাখার ২৩০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ আটকে আছে। এরমধ্যে ৭৬ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ায় প্রভিটা ফিশ ফিডের নামে এনআই অ্যাক্টের আওতায় ৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ঋণখেলাপি হওয়ায় প্রভিটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুন্নবী ভূঁইয়া, তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান সুলেখা ইব্রাহিম এবং তাদের ছেলে ও পরিচালক রিদওয়ানুল হক ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ২০টি মামলা হয়েছে। চেক প্রত্যাখ্যানের (এনআই অ্যাক্ট) কারণে দায়ের করা হয়েছে ১৮টি মামলা।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত প্রভিটা গ্রুপের কর্ণধারদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আদালতের তথ্যমতে, ব্যাংক এশিয়ার দায়ের করা ১৭৩ কোটি টাকার ঋণ আদায়ের মামলায় এই আদেশ দেওয়া হয়।
২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে প্রভিটা গ্রুপ পোল্ট্রি খাতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান গড়ে তোলে। তবে অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং মহামারিজনিত ক্ষতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি এই বিপর্যয়ে পড়ে।
গ্রুপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন দুশ্চিন্তায়। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন-এই সাম্রাজ্য কি পুনরায় দাঁড়াতে পারবে, নাকি এটি একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হবে?
সার্বিক বিষয়ে জানতে প্রভিটা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুন্নবী ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি।

