২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর আর্থিক অপরাধগুলোর একটি। তদন্তে উঠে এসেছে, এ ঘটনার মূল পরিকল্পনায় ছিলেন তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তার নেতৃত্বে একটি চক্র হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে দেশের রিজার্ভ তছনছ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গভর্নর আতিউরের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় রিজার্ভ চুরির পরিবেশ তৈরি করা হয়। তিনি সুইফট এবং আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) এর মধ্যে কানেকশন স্থাপনের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। এ কাজে সহায়তা করতে ভারতীয় নাগরিক নীলা ভান্নানকে আনা হয়। যার মাধ্যমে আরটিজিএস স্থাপন ও সুইফট সিস্টেমে সংযোগ স্থাপিত হয়। এরপর ধাপে ধাপে হ্যাকারদের মাধ্যমে অর্থ লুট করা হয়।
সুইফট সিস্টেমে হ্যাকারদের প্রবেশ সহজ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহার সহযোগিতায় একটি ইমেইল আদান-প্রদানের মাধ্যমে চক্রটি কাজ শুরু করে। হ্যাকিং সফল করার পর আলামত ধ্বংস করার দায়িত্ব দেওয়া হয় রাকেশ আস্তানা নামে আরেক ভারতীয় নাগরিককে। তাকে সরাসরি সার্ভার রুমে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
হ্যাকিংয়ের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ড. আতিউর কর্মকর্তাদের মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করেন। তিনি বোর্ডরুমে সবাইকে ডেকে বলেন, “যদি কেউ হ্যাকিংয়ের কথা প্রকাশ করে, তার চাকরি থাকবে না।” ঘটনাটি যাতে বাইরে না যায়, সেজন্য তিনি মামলার ফাইল প্রস্তুতেও নানা কারসাজি করেন। এমনকি আলামত ধ্বংস করার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রাকেশ আস্তানার মাধ্যমে সার্ভার মুছে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়।
এ ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থা, আইসিটি মন্ত্রণালয়, কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নেওয়ার বদলে ঘটনাটি চেপে রাখা হয়। বিষয়টি সামনে আসে যখন ফিলিপিন্সের একটি পত্রিকা রিজার্ভ লুটের খবর প্রকাশ করে।
সিআইডি ও এফবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে যে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এত বড় ধরনের হ্যাকিং সম্ভব ছিল না। গভর্নর আতিউর ও তার ঘনিষ্ঠদের অপরাধ প্রমাণিত হলেও, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায়ও বাধা সৃষ্টি করা হয়। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রভাবশালীদের চাপে মূল অপরাধীদের এড়িয়ে একটি অসম্পূর্ণ চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়।
দুদকও এ ঘটনার তদন্ত শুরু করে এবং প্রমাণ হিসেবে সিআইডি থেকে মামলার নথি চায়। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, গভর্নর আতিউরসহ অন্তত ১২-১৩ জন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং দুজন ভারতীয় নাগরিক এই চক্রের সঙ্গে জড়িত।
ড. আতিউর রহমান এতদিন একজন সজ্জন ও সুশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে রিজার্ভ লুটের ঘটনায় তার জালিয়াতির পর্দা উঠে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’র সেই চোরের মতোই তিনি সাধুবেশে ভয়াবহ অপরাধ ঘটিয়েছেন।
৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. আতিউর দেশ ত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তদন্ত সংস্থা তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুটের ঘটনা দেশের আর্থিক খাতে একটি বড় ধরনের আঘাত হানে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয় বরং প্রশাসনিক দুর্বলতারও একটি নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকবে। তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে শেষ হলে হয়তো দেশবাসী প্রকৃত অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন হতে দেখবে।

