বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ মাস আগে বিতর্কিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) কে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আভিভা ফাইন্যান্স থেকে সরিয়ে দেয়। তবে এটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়নি। এখনো প্রতিষ্ঠানটি এস আলমের দুই গৃহকর্মী ও এক গাড়িচালককে বেতন দিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রামের দুটি শাখা ও প্রধান কার্যালয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, আভিভা ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদটি বর্তমানে শূন্য। যারা এখন প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন, তাদের অনেকেই একসময় প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের সঙ্গে কাজ করেছেন। পি কে হালদার একসময় আভিভা ফাইন্যান্সের এমডি ছিলেন। আর এস আলম ছিলেন চেয়ারম্যান।
গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২,৯২৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে ২,৬২৯ কোটি টাকা খেলাপি। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৮৯.৮১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- এর মধ্যে ১,৮৫৮ কোটি টাকা নামে-বেনামে তুলে নেওয়া হয়েছে। যার ৬৩.৪৫ শতাংশের গন্তব্য ছিল এস আলমের পকেট। ফলে গ্রাহকরা দীর্ঘদিন ধরে আমানতের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।
আভিভা ফাইন্যান্সের চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের আগ্রাবাদ শাখায় অনুসন্ধানে জানা গেছে, অফিস সহকারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত কুলসুম আক্তারের মাসিক বেতন ৩৫ হাজার টাকা এবং গাড়িচালক লালু মিয়ার বেতন ৩০ হাজার টাকা। তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, এরা অফিসে কখনো আসেননি। কুলসুম আক্তার এস আলমের চট্টগ্রামের সুগন্ধা এলাকার বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। আর লালু মিয়া তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িচালক।
এছাড়া ওআর নিজাম সড়কের ইকুইটি সেন্ট্রিয়াম ভবনে অবস্থিত আভিভা ফাইন্যান্সের জিইসি শাখায় অফিস সহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত মর্জিনা আক্তারও অফিসে উপস্থিত হন না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এদের বেতন প্রতিষ্ঠান থেকে পরিশোধ করা হলেও তারা মূলত এস আলমের ব্যক্তিগত কর্মচারী।
এর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এস আলমের গৃহকর্মী মর্জিনা আক্তারের ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য পায়। এছাড়া তাঁর স্বামী সাদ্দাম হোসেনকে এস আলম গ্রুপের তত্ত্বাবধানে ইসলামী ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ মুখ্য কর্মকর্তা (এসপিও) পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের পর তিনি প্রথমে চট্টগ্রামের দক্ষিণ জোনে পদায়িত হন। তবে সরকার পরিবর্তনের পর তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।
মর্জিনা আক্তারের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে বেশ কয়েকটি হিসাব খোলা হয়। চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এক শাখায় তাঁর নামে থাকা হিসাবে গত বছরের ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া, ইসলামী ব্যাংকে তাঁর নামে থাকা ২২টি হিসাবে ১ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী আমানতের অস্তিত্ব মিলেছে।
প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, গত বছরের মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে সাইফুল আলমের নামে চারটি স্থায়ী হিসাব খোলা হয়। যা পরিচালনা করেন আভিভা ফাইন্যান্সের কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামে এস আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এস এম ফজলুল কাদের রিপন। ওই হিসাবগুলোর নম্বর যথাক্রমে ২১৩-৫১, ২১৩-১০৮, ২১৩-৫৬ ও ২১৩-৫৪। এসব হিসাবে মোট ৬ কোটি ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪২৫ টাকা জমা করা হয়।
সরকার পরিবর্তনের পর এসব হিসাবের মালিকানা পরিবর্তন করা হয়। জিএম এন্টারপ্রাইজ ও ইমপালস ট্রেডিং নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে নতুন মালিকানা দেখিয়ে ওই হিসাবগুলো থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এস আলমের ব্যক্তিগত হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকায় এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
আভিভা ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্বে) মো. মোস্তফিদুজ্জামান জানান, এস আলমের কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ কিংবা আমানতের হিসাব পরিবর্তন করে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা নেই। তবে প্রতিষ্ঠানটি ঋণ আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা ফেরত দেওয়ার কাজ করছে।
এস আলমকে সরিয়ে দিলেও আভিভা ফাইন্যান্সের কার্যক্রমে তার নিয়ন্ত্রণের ছাপ স্পষ্ট। গৃহকর্মী ও গাড়িচালকের নামে বেতন পরিশোধ থেকে শুরু করে কোটি কোটি টাকার লেনদেন পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন থেকে যায়—এসব অনিয়ম ও বিতর্কিত লেনদেনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না?

