পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত এএফসি এগ্রো বায়োটেক লিমিটেড পণ্য সরবরাহ, ব্যয় ও স্থাপনা ভাড়া এই তিন খাতে সুদ ছাড়াই ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে প্রায় ৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ভ্যাট খুলনা কমিশনারেটের নিরীক্ষায় এই ফাঁকি উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হলেও কোনো জবাব দেয়নি।
ভ্যাট অফিসকে অসহযোগিতা করারও অভিযোগ উঠেছে। ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
এনবিআর সূত্রমতে, খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার কৈয়া বাজার উত্তর শৈলমারি এলাকার প্রতিষ্ঠান এএফসি এগ্রো বায়োটেক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটনে ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত নিরীক্ষা করে খুলনা ভ্যাট কমিশনারেট। নিরীক্ষার সময় প্রতিষ্ঠানের অডিট রিপোর্ট (কর অঞ্চল খুলনা থেকে সংগ্রহ করা), ভ্যাট-সংক্রান্ত দলিলাদি, বার্ষিক প্রতিবেদন ও বাণিজ্যিক দলিলাদি যাচাই করা হয়। এতে হিসাবের ব্যাপক গরমিল পাওয়া যায়।
প্রতিষ্ঠানের দাখিলপত্র ও সিএ ফার্ম অনুমোদিত অডিট রিপোর্ট যাচাইয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত মোট পণ্য বিক্রি করেছে মোট ১৯ কোটি ৪১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪৭ টাকা (ভ্যাট ইনক্লুসিভ বা সব বিক্রয়মূল্য ভ্যাটসহ)। আবার একই অর্থবছর পণ্য বিক্রি করেছে ১৬ কোটি ৮৮ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪ টাকা (ভ্যাট এক্সক্লুসিভ বা ভ্যাট ছাড়া বিক্রি)। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট রিটার্নে বিক্রি দেখিয়েছে ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ৪১ হাজার ১৭৩ টাকা। বাকি এক কোটি ৯২ লাখ ৮০ হাজার ৭৮০ টাকার বিক্রয় রিটার্নে দেখানো হয়নি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি অডিট রিপোর্টে এই বিক্রি দেখালেও ভ্যাট রিটার্নে দেখায়নি, যার ওপর ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ২৮ লাখ ৯২ হাজার ১১৭ টাকা।

সূত্র আরো জানায়, এএফসি এগ্রো বায়োটেক একটি লিমিটেড প্রতিষ্ঠান। এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী, লিমিটেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা কেনাকাটার ওপর উৎসে ভ্যাট কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমাদান করতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত এক টাকাও উৎসে ভ্যাট কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়নি। প্রতিষ্ঠানের অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত গাড়ি মেরামত, বিনোদন, ল্যাব সরঞ্জাম, প্রিন্টিং ও স্টেশনারি, রক্ষণাবেক্ষণ, বিজ্ঞাপন, পরিবহন, মার্কেটিং, স্যাম্পল, কুরিয়ার, অডিট, এজিএম, ভূমি উন্নয়ন, আসবাবপত্র, অফিস সরঞ্জামাদি, মোটরগাড়ি, ইন্টেরিয়রসহ বেশ কয়েকটি খাতে যে ব্যয় করেছে, তার উপর কোনো উৎসে ভ্যাট কর্তন করেনি।
একইভাবে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিবছর এসব ব্যয় বা কেনাকাটার ওপর কোনো উৎসে মূসক কর্তন করেনি প্রতিষ্ঠান। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত যে ব্যয় বা কেনাকাটা ১৭১ কোটি ৫৭ লাখ ৪২ হাজার ১৩ টাকার ভ্যাটযোগ্য ব্যয় বা কেনাকাটা করেছে, যাতে ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে আট কোটি ৭৬ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯০ টাকা।
প্রতিষ্ঠানটি স্থান-স্থাপনা ভাড়ায় কোনো ধরনের ভ্যাট দেয়নি। এএফসি এগ্রো বায়োটেক লিমিটেড ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্থাপনা ভাড়া দিয়েছে এক কোটি ৭৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা, যাতে ভ্যাট আরোপযোগ্য ভাড়া পরিশোধ করেছে এক কোটি ৫১ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫২ টাকা, যাতে ১৫ শতাংশ হারে প্রযোজ্য ভ্যাট ২২ লাখ ৭৩ হাজার ৩৪৮ টাকা, যার এক টাকাও প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করেনি। তবে স্থান-স্থাপনা ভাড়া নেয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠান অস্বীকার করেছে।
ভ্যাট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাই করে ভাড়া নেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত বিক্রয় তথ্য গোপন করে ২৮ লাখ ৯২ হাজার ১১৭ টাকা, প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা কেনাকাটার উপর ৮ কোটি ৭৬ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯০ টাকা ও স্থাপনা ভাড়ার ওপর ২২ লাখ ৭৩ হাজার ৩৪৮ টাকাসহ সুদ ছাড়া মোট ৯ কোটি ২৮ লাখ ১৯ হাজার ৮৫৫ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।
উল্লেখ্য, পুঁজিবাজারে এএফসি এগ্রো বায়োটেকের শেয়ারদর দীর্ঘদিন ফ্লোর প্রাইসে আটকে ছিল। গত বছরের ১৮ জানুয়ারি ফ্লোর প্রাইস উঠে গেলে কোম্পানিটির শেয়ারদরে ক্রমাগত পতন ঘটে। ওই দিন কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ২৩ টাকা ৫০ পয়সার, যা গতকাল রোববার ৯ টাকা ১০ পয়সায় ঠেকেছে। অর্থাৎ বছরের ব্যবাধানে শেয়ারদর ১৪ টাকা ৪০ পয়সা বা ৬১ শতাংশ কমে ফেস ভ্যালুর নিচে নেমে এসেছে।
২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিভুক্ত কোম্পানিটি বর্তমানে জেট ক্যাটেগরিতে রয়েছে। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে রয়েছে ৩৮ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ৩৪ দশমিক ১১ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা পরিচালদের হাতে রয়েছে ২৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ শেয়ার।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিক দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে খুলনা ভ্যাট কমিশনারেট। লিখিত জবাব দিতে প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের সময় দেয়া হয়। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নিতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত শুনানিতে অংশ নিতে ছয়বার চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা একবারও অংশ নেননি। নোটিশের জবাবও দেননি।
মালিক বিদেশে, এমন অজুহাতে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা ভ্যাট অফিসকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি। প্রায় এক বছর পর চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়। এতে ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানকে সুদ ছাড়া মোট ৯ কোটি ২৮ লাখ ১৯ হাজার ৮৫৫ টাকা পরিশোধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

