সারা দেশে প্রায় ৪০ হাজার জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও, এর মধ্যে মাত্র ৮ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধিত। অর্থাৎ ৮০ শতাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান এখনো ভ্যাটের আওতার বাইরে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। যার আওতায় সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে এবং ঢাকাসহ ১৮টি জেলার সব গয়নার দোকানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বা ভ্যাট মেশিন স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে।
এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব উত্তম বিশ্বাস গতকাল বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সভাপতিকে পাঠানো এক চিঠিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। চিঠিতে বাজুসকে অনুরোধ করা হয়েছে, যেন তারা তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠির মাধ্যমে ভ্যাট নিবন্ধন ও ইএফডি স্থাপনে উৎসাহিত করে।
এনবিআরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪০ হাজার জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাজুসের সদস্যসংখ্যা ২৩ হাজার। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৮ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন করেছে। এখন পর্যন্ত ১ হাজার জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন বসানো হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই খাত থেকে এনবিআরের আদায়কৃত ভ্যাটের পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি টাকা।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাজুস নেতৃবৃন্দের সাম্প্রতিক এক আলোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত সপ্তাহে জুম প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। বাজুস তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট নিবন্ধন ও ইএফডি মেশিন বসানোর জন্য চিঠি দেবে। অন্যদিকে কমিশনাররা নিশ্চিত করবেন, যাতে সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান বাজুসের সদস্যপদ নিতে পারে।
বৈঠকে জেনেক্স ইনফোসিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহ জালাল উদ্দিন ইএফডি মেশিন স্থাপনের একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এনবিআরের ভ্যাট কমিশনাররা জানিয়েছেন, এই পরিকল্পনার ভিত্তিতেই ইএফডি স্থাপন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এনবিআর জানিয়েছে, ঢাকাসহ দেশের ১৮টি জেলায় সব গয়নার দোকানে ইএফডি মেশিন বসানো হবে। এজন্য বাজুসের কাছে এসব এলাকার জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ১৮টি জেলা হলো—ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি।
জুয়েলার্স সমিতির এক নেতা নাম বলেন, ঢাকার অভিজাত বিপণিবিতানগুলোর অনেক জুয়েলারি দোকানে ইতোমধ্যে ইএফডি মেশিন বসানো হয়েছে। তবে অখ্যাত মার্কেট, অলিগলি বা ঢাকার আশপাশের দোকানগুলোর বেশিরভাগই এখনো ভ্যাট দেয় না। এতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন, যেন সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ভ্যাট পরিশোধের একই নিয়ম চালু করা হয়।
এর আগে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) ব্যবস্থার মাধ্যমে ভ্যাট আদায় করা হতো। ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন স্থাপন শুরু হয়। তবে করোনা মহামারির কারণে সেই কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের আগস্টে এনবিআর জেনেক্স ইনফোসিসের মাধ্যমে পুরোদমে ইএফডি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে ৬০ হাজার এবং পরবর্তী পাঁচ বছরে তিন লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন বসানোর কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র ১৬ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এই মেশিন স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।
এনবিআর আশা করছে, নতুন উদ্যোগের ফলে জুয়েলারি খাতে ভ্যাট আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমবে। তবে সফল বাস্তবায়নের জন্য জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

