বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও নগদ হয়ে ওঠে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এমএফএস। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের সরকারি উপবৃত্তির টাকা পেতে হলে নগদ– এর একাউন্ট খুলতে হবে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত যার পেছনে চালিকাশক্তির ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর আওতাভুক্ত নিম্ন আয়ের মানুষদেরও তাঁদের ভাতার জন্য নগদ এর একাউন্ট খুলতে বাধ্য করা হয়। কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই দেওয়া হয় এধরনের সরকারি চুক্তি, যার ফলে বাজারের অন্যান্য প্রতিযোগীদের জন্য অসম ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।
‘নগদ’ দেশে মুঠোফোনে আর্থিক সেবা প্রদানকারী (এমএফএস) দ্বিতীয় বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সরকারি চুক্তির একক সুবিধাভোগী হয়ে ৯ কোটির বেশি নিবন্ধিত গ্রাহক অর্জন করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের কিছুদিন পরেই গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ এর নিয়ন্ত্রণ নেয়, এবং একজন প্রশাসক নিয়োগ দেয়। এসময় নগদ এর গ্রাহক সংখ্যা ৯ কোটির বেশি ছিল যার মধ্যে ৭০ শতাংশই হলেন সরকারি উপবৃত্তি ও ভাতার প্রাপক। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন নগদ- এর জন্য নতুন কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের সন্ধান করছে।
দেশের ২৩ কোটি এমএফএস অ্যাকাউন্টের প্রায় ৩৮ শতাংশ নগদ এর হলেও দৈনিক ৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেনে মাত্র ২০ শতাংশ অবদান রাখে। কারণ তাদের সক্রিয় ব্যবহারকারী মাত্র ২ কোটি ৭০ লাখ, বাকিরা মূলত মাঝেমধ্যে ব্যবহার করেন সরকারি উপবৃত্তি ও ভাতার টাকা নিতে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের থেকে ২০১৭ সালে ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রদানের চুক্তি পেয়েছিল থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস। পরে এটিকেই নগদ নামে রি-ব্রান্ড করা হয়।
এদিকে পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স ছাড়া ছয় বছর কার্যক্রম চালানোর পরে নগদ এর বৈধতা বর্তমানে বিতর্কের মুখে পড়েছে। আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই কোম্পানিটি এখন মালিকানা সংকটেরও সম্মুখীন। কিন্তু, প্রতিষ্ঠানের বিপুল গ্রাহক ভিত্তি থাকায় এর অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। নগদ অন্তর্বর্তীকালীন লাইসেন্সের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল— মোট সাত বার এই লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
নাম না প্রকাশের শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন নির্বাহী বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ তত্ত্বাবধান ও তদারকিতে ‘নগদ’ পরিচালিত হয়, কারণ তারা অনাপত্তি সনদ বা এনওসি নিয়ে কাজ করছিল। বিধিমালা ভঙ্গ করে গ্রাহকের আমানতের বিপরীতে ঋণ নিয়েছে নগদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং থাকার কারণেই যে সম্পর্কে জানা যায়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পরে এসব ঋণ সমন্বয় করা হয়।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক্সিম ব্যাংক থেকে নগদের গ্রাহকদের অর্থ জমা রাখা ‘ট্রাস্ট ফান্ডের’ বিপরীতে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেয় থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস। এমএফএসের নিয়ম লঙ্ঘন করেই গ্রাহকদের অর্থ জামানত হিসেবে ব্যবহার করে ঋণ নেওয়া হয়। কারণ গ্রাহকের জমা টাকা কোম্পানিটির একটি দায়, যা ঋণের গ্যারান্টি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
এদিকে ঋণের জামানত রাখার পর নগদ- এর একাউন্টে তৈরি হয় ঘাটতি। অর্থাৎ, নগদ তার গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট বা ‘ট্রাস্ট ফান্ড’-এ রাখা প্রকৃত অর্থের চেয়ে ভার্চুয়ালি অনেক বেশি ই-মানি তৈরি করে। অথচ, এমএফএসের শর্ত অনুযায়ী, ই-মানির পরিমাণ অবশ্যই লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে থাকা টাকার সমপরিমাণ হতে হবে। ইলেকট্রনিক মানি (ই-মানি) মানে মূল টাকার হিসাবের বিপরীতে ইলেকট্রনিকভাবে সঞ্চিত আর্থিক মূল্য, যা লেনদেনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক ঋণ সমন্বয় করে নগদ। এরমধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে শেষ কিস্তির ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা বাকি আছে বলে গত আগস্টে এক ভার্চুয়াল ইভেন্টে অংশ নিয়ে জানান নগদ এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক। নগদ এবং থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস উভয় প্রতিষ্ঠানেরই শেয়ারহোল্ডার তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন সিনিয়র নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, নগদ এর লাইসেন্স গ্রহণের পথে একমাত্র বাধা ছিল তাঁদের একটি সাবসিডিয়ারি গঠন করতে না পারা, এমএফএস বিধিমালায় যার বাধ্যকতা রয়েছে। তিনি বলেন, লাইসেন্স না থাকায় কোম্পানিটি কোনো লাভ হয়নি, বরং বিতর্কের মধ্যে পড়েছে।
তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক বলেন, ডাক বিভাগের সঙ্গে সাবসিডিয়ারি গঠনের সব ধরনের চেষ্টা করে নগদ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় কারণ ডাক বিধিমালায় এর অনুমতি নেই। তবে ডাক বিভাগকে ছাড়াই কোম্পানিটি একটি স্বতন্ত্র সাবসিডিয়ারি গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রকারের থেকে পাওয়া সর্বশেষ চুক্তির আওতায়, ১,০০০ কোটি টাকা মূল্যের প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ডের একমাত্র বিতরণকারী হয় নগদ। ২০২৪ সালের জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে টানা চতুর্থবারের মতো শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নগদ এই ডিস্ট্রিবিউশনশিপ পায়। ঐ বছরের ৩০ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এই ট্রাস্টের আওতায় নগদকে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে উপবৃত্তি বিতরণের একমাত্র ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে অনুমোদন দেয়।
চুক্তি অনুযায়ী, এই তহবিলের আওতাধীন ৫৪ লাখ সুবিধাভোগীর মধ্যে ৩৪ লাখকে উপবৃত্তি পেতে হলে তাদের একাউন্টকে অন্যান্য এমএফএস সেবাদাতা থেকে নগদে রূপান্তর করতে হবে।
এভাবেই রাষ্ট্রীয় সমর্থনে দ্রুত ফুলেফেঁপে উঠতে থাকে নগদ, বিশেষত পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়-ও এই কোম্পানির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট এমন কথাবার্তাও শোনা যেতে থাকে। যা কোম্পানিটির প্রসারে আরও সহায়তা করে।
আয় ভাগ করে নেওয়ার মডেলের ওপর ভিত্তি করে পেমেন্ট সেবাদাতা হিসেবে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস যখন প্রথম ডাক অধিদপ্তরের সাথে চুক্তিতে প্রবেশ করে, তখন হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) উপদেষ্টা ছিলেন জয়। ২০১৬ সালে ইনকর্পোরেটেড হয় থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস, এবং ২০১৭ সালে ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবাদাতার চুক্তিটি পায়, তখন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তারানা হালিম।
চুক্তি প্রদানের সময়, আওয়ামী লীগের দুজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক এবং রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ছিলেন থার্ড ওয়েভের প্রধান শেয়ারহোল্ডার। আরেকজন শেয়ারহোল্ডার ছিলেন হাসিনার তৎকালীন উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের স্ত্রী রেজওয়ানা নূর। থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসকে যখন ২০১৯ সালে নগদ হিসেবে রি-ব্রান্ড করা হয়, তখন এটির উদ্বোধন করেন হাসিনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স ছাড়াই মোবাইলে ব্যাংকিং সেবা প্রদানের কার্যক্রম চালাতে শুরু করে নগদ। পরে ডাক বিভাগ অন্তর্বর্তীকালীন অনুমতি নেয়, তবে শর্ত ছিল পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্সের জন্য একটি সাবসিডিয়ারি গঠন করতে হবে। তবে নগদ ওই অন্তর্বর্তীকালীন অনুমতির মেয়াদ সাতবার বাড়ানো হয়, যার মাধ্যমে ছয় বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে নগদ– এই ঘটনা কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাবের বিতর্কিত ভূমিকাকে আরও উস্কে দিয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো এমএফএস কোম্পানিকে অবশ্যই একটি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থার সাবসিডিয়ারি বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান হতে হবে। পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স পেতে ডাক বিভাগকে একটি সাবসিডিয়ারি গঠন করতে হতো, তবে বিদ্যমান আইন তাতে বাধা হয় দাঁড়ায়। সাবসিডিয়ারি হিসেবে একটি আর্থিক কোম্পানি গঠনের জন্য বারবার প্রচেষ্টা ও অন্তর্বর্তী লাইসেন্স দেওয়া সত্ত্বেও, বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থন নগদ- এর কার্যক্রম নিয়মিত করতে ব্যর্থ হয়।
ডাক বিভাগের সঙ্গে সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনে ব্যর্থ হওয়ার পরে নগদ এর মালিকদের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) একটি লাইসেন্স দেওয়া হয়, যেন এর আওতায় তারা একটি সাবসিডিয়ারি গঠন করতে পারেন। তার আগে, বাংলাদেশ ব্যাংককে তার এমএফএস বিধিমালা, ২০২২ সংশোধন করে একটি নতুন বিধান যুক্ত করতে হয়েছিল যাতে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমএফএস-এর জন্য সহায়ক বা সহযোগী সংস্থা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে এনবিএফআই লাইসেন্স পাওয়ার মাত্র দুই মাস পরে নগদ তার মত পরিবর্তন করে, একটি ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দ্বারস্থ হয়। নগদ এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল ব্যাংক নীতিমালা করতে হয়, দেশে ব্যাংকিংয়ের যা একটি নতুন কনসেপ্ট।
২০২৩ সালের জুনে ডিজিটাল ব্যাংক নীতিমালা অনুমোদন লাভের পরপরই নগদ এর অধীনে একটি ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিল। এই লাইসেন্সের অধীনেই একটি সাবসিডিয়ারি গঠনের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রমকে বৈধ করতে পারতো।
৫২টি কোম্পানি এই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলেও – নগদ ও কড়ি – মাত্র দুটি কোম্পানিকে তা দেওয়া হয়। এমনকী দেশের বৃহত্তম মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতা বিকাশ- এর আবেদনও বাতিল করা হয়।
ব্যাংক কোম্পানি আইনে একক ব্যক্তি, পরিবার বা কোম্পানির কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণে যে বিধিনিষেধ রয়েছে, সেটিতেও ছাড় দেওয়া হয়েছে নগদকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরোধের প্রেক্ষিতেই অর্থমন্ত্রণালয় এই অব্যাহতির অনুমতি দেয়। নগদ এর পাশাপাশি কড়ির জন্যও আইনের ব্যতিক্রম করতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে।
নগদের মালিকানায় থাকা তিনটি কোম্পানির ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার রয়েছে। এগুলো হলো– ওরিসিস ক্যাপিটাল পার্টনার্স এলএলসি (যুক্তরাষ্ট্র), ব্লু হ্যাভেন ভেঞ্চার্স এলএলসি (যুক্তরাষ্ট্র) এবং ফিনক্লুশন ভেঞ্চার্স পিটিই লিমিটেড (সিঙ্গাপুর)। এরমধ্যে সর্ববৃহৎ অংশীদারত্ব রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ওরিসিস ক্যাপিটাল পার্টনার্স এলএলসি’র। তাদের হাতে রয়েছে ৬.২২৫ কোটি শেয়ার, যা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের প্রায় অর্ধেক বা ৪৯.৮০ শতাংশ। কোম্পানির একজন শেয়ারহোল্ডার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুক ছিলেন ওরিসিস এর প্রতিনিধি।
যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক আরেকটি কোম্পানি ব্লু হ্যাভেন ভেঞ্চার্স এলএলসি’র রয়েছে ৩.১২৫ কোটি শেয়ার, বা ২৪.৯০ শতাংশ মালিকানা। তাদের প্রতিনিধি হলেন সামিট গ্রুপ অব কোম্পানির একজন পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ খান। সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক ফিনক্লুশন ভেঞ্চার্স পিটিই লিমিটেড এর মালিকানায় রয়েছে ১.৩৭৫ কোটি শেয়ার, যা নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের ১১ শতাংশ শেয়ার। নগদের কর্মকর্তা নকিব চৌধুরী ফিনক্লুশনের প্রতিনিধি।
আহসান এইচ মনসুর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহ পরে গত ২২ আগস্ট নগদে একজন প্রশাসক নিয়োগ দেন। পাশাপাশি আগের পরিচালনা পর্ষদও বিলুপ্ত করা হয়।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও ছয় কর্মকর্তাকে নগদ এর প্রশাসক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক মো. বদিউজ্জামান দিদারের সহযোগী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর আগে ১৮ আগস্ট, মনসুর নগদ- এর ডিজিটাল ব্যাংকিং লাইসেন্স স্থগিত করে- লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেন।
এছাড়া, নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসির ৯৪ শতাংশ শেয়ারের মালিকানায় থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক পাঁচটি কোম্পানির বিষয়েও তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রগুলো জানায়, কোম্পানিগুলোর বর্তমান মালিকদের নাগরিকত্ব, নিবন্ধন, ঠিকানা, ব্যবসায়িক তথ্যের মতো বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শেয়ারহোল্ডার পাঁচটি কোম্পানি নিবন্ধন নেয়।
এদিকে নগদে প্রশাসক নিয়োগের পর থেকে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে, ফলে গ্রাহকদের মধ্যে কোম্পানিটি তার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে কিনা এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে নগদ এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ফলে এমএফএস বাজারে বিকাশের মনোপলি পুনর্জীবন লাভ করেছে। যেকারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এমতাবস্থায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর নগদে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসক নিয়োগ করা কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
নগদের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শাফায়েত আলমের এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এ আদেশ দেন।
এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মনসুর জানান, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীর কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে একজন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কোম্পানিটি এর আগে ডাক বিভাগের অধীনে একই নামে পরিচালিত হয়েছে, কিন্তু জনস্বার্থে এখন সরকার এটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তাই নগদ এখন সম্পূর্ণরূপে সরকারি মালিকানাধীন সত্ত্বা।
ডাক অধিদপ্তরের পরিচালক গত ২২ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত পাঁচ বছরে নাগাদের কার্যক্রম অন্যান্য বিশেষায়িত ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে, কোনও অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে নগদে নবনিযুক্ত প্রশাসক বদিউজ্জামান দিদার বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্দেশ্য হলো এমএফএস সেবাদাতাটির উন্নয়ন করা, এটিকে বন্ধ করা নয়।
এদিকে নগদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মনসুর জানান, নগদের জন্য তাঁরা এখন নতুন কৌশলগত বিনিয়োগকারী খুঁজছেন।
তিনি বলেন, নতুন কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের জন্য উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে নগদের নতুন ব্যবস্থাপক টিমের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক, যাতে এটি বিকাশ- এর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। নগদকে মেরে ফেলা হচ্ছে না; বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে সেটাকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, এমএফএস খাতে অনেক সমস্যা আছে। আমাদের প্রধান প্লেয়ার একটাই বিকাশ। নগদকে দ্বিতীয় স্থানে ধরা হয়। কিন্তু স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, যথাযথ লাইসেন্স না থাকা বা নিয়ন্ত্রক বিধিমালা অনুসরণ না করার মতো এর অন্যান্য অনেক সমস্যা আছে।
নগদের সাথে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মিশুক বলেন, ডাক বিভাগের কাজের বিষয়ে তার সাথে আমি তিনবার দেখা করেছি, এবং আমি নিশ্চিত তিনি আমার নাম-ও জানেন না। পেটিএম এবং হুয়াওয়ের মতো কোম্পানিগুলো আমাকে গোনাতেও ধরে না। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রীর ছেলের সাথে আমার ছবি দেখার পরে হুয়াওয়ের কর্মকর্তারা প্রতিদিনই আমার অফিসে আসতেন দেখা করতে। সুতরাং বলাই যায়, বিষয়টি আমি উপভোগই করেছি।
মিশুক বলেন, নগদ নিজেই লাইসেন্স নিতে পারে, কেন আমরা ডিজিটাল ব্যাংককে শেয়ার দিতে যাব? ডিজিটাল ব্যাংকে নগদের মালিকানা হলো ১১ শতাংশ, এর বাইরের মালিকানা ৮৯ শতাংশ। তাই আমি ডিজিটাল ব্যাংককে শেয়ার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কঠোর পরিশ্রম করে নগদকে আমি আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছি, তাই আমি এটি স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনা করব ও লাইসেন্স নেব। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ এনওসির মাধ্যমে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অনুমোদন দিয়েছে। আমি মনে করি, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারব।
এসময় তিনি স্বীকার করেন যে, নগদের লাইসেন্সের বাধ্যবাধকতা পূরণে কোনোকিছুই আমাদের আটকাতে পারবে না।
গত বছরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দেশত্যাগ করেন মিশুক, এরপর গত ১৮ আগস্ট বিদেশে থেকে স্টার্টআপ উদ্যোক্তা ও সাংবাদিকদের এক ভার্চুয়াল আয়োজনে যুক্ত হয়ে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

