ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে দীর্ঘ চার বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল থাকার পাশাপাশি তিনি প্রকল্প ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ব্যক্তি।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা টানা তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকতে পারেন না। তবে ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি মুক্তাগাছা অফিস থেকে পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জামাল হোসেন চার বছর ধরে এই পদে বহাল রয়েছেন। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পরও যখন অনেক কর্মকর্তার বদলি হয়েছে, তখনও তিনি তার পদ ধরে রেখেছেন।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে যে, ৫ আগস্টের পর জামাল হোসেন তার অফিসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টাঙিয়ে রাখেন। যা পরে সাংবাদিকদের চাপে সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হন।
নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেন ঠিকাদারি কাজে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, তিনি নামমাত্র টেন্ডার আহ্বান করলেও তার পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন এবং কমিশন গ্রহণ করেন।
২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে ২১টি প্যাকেজের প্রায় ৩০ কোটি টাকার ইজিপি টেন্ডার সম্পন্ন হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে যে, টেন্ডারের আগে ও পরে জামাল হোসেন দীর্ঘদিন অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন এবং প্রকল্প বিক্রির বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করেছেন।
একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, ইজিপি সিস্টেমের স্বচ্ছতা থাকার পরও তিনি কৌশলে দরপত্রের রেট বিক্রি করেন। নির্ধারিত দরপত্রের চেয়ে ১০% কম দামে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের সুযোগ করে দেন। ফলে অন্য ঠিকাদাররা অংশ নিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পান না।
মানবসম্পদ প্রকল্প, মুজিববর্ষ, আশ্রয়ন প্রকল্প এবং নলকূপ স্থাপন প্রকল্পেও নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই প্রকল্পগুলোর অর্থ লুটপাট করা হয়েছে এবং দুদক তদন্ত করলেই দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হবে।
স্থানীয় সাংবাদিকরা যখন এসব দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য ‘ক’ ফরমে আবেদন করেন। তখন জামাল হোসেন তালবাহানা করতে থাকেন। তিনি “দিচ্ছি-দিবো” বলে সময়ক্ষেপণ করেন এবং কোনো তথ্য প্রদান করেননি।
নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কিছু কর্মচারীও অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ফুলপুরের মাঠ কর্মচারী আজহারুল ইসলাম সরকারি নিয়ম অনুযায়ী গ্রাম অঞ্চলে থাকার কথা থাকলেও তিনি ময়মনসিংহ বিভাগীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক এসডিও অফিসের বিলাসবহুল ভবনে থাকেন। ৮-৯টি কক্ষ বিশিষ্ট এই ভবন পরিত্যক্ত দেখিয়ে তিনি বিনামূল্যে ব্যবহার করছেন। ফলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।
ময়মনসিংহ জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ক্যাশিয়ার সুকান্ত বনিক বাবু দীর্ঘদিন ধরে একই পদে রয়েছেন। নরসিংদীতে তার বদলি আদেশ হলেও জামাল হোসেনের সুপারিশে সেটি স্থগিত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, এই ক্যাশিয়ার টেন্ডার সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান সদস্য।
এছাড়া ভালুকা, সদর, ফুলবাড়িয়া, গৌরীপুর, নান্দাইল ও হালুয়াঘাট উপজেলার একাধিক মেকানিক্স প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে যে, তারা ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে প্রকল্পের কাজ না করেই বিল উত্তোলন করেছেন।
ফুলপুর উপজেলার মাঠকর্মী আজহারুল ইসলাম বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা করছেন। তার সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, ৫ আগস্টের পরও যদি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা বহাল থাকে, তবে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হবে। তারা মনে করছেন, এসব কর্মকর্তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থ করতে চাইছেন। তাই তারা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। স্থানীয়দের মতে, দ্রুত তদন্ত করে তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হবে এবং সরকার দুর্নীতি দমনে ব্যর্থ বলে বিবেচিত হবে।

