চট্টগ্রামে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত তিন ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এদের কেউ দুবাই গেছেন ১০, ২২, ২৬ কিংবা ৩৭ বার। কারো বাড়ি সোনায় মোড়ানো সাততলা। যার নাম স্থানীয়দের কাছে ‘গোল্ডেন বাড়ি’ হিসেবেই পরিচিত। কারো দশতলা, আবার কারো পাঁচতলা বাড়ি। হঠাৎ করে ফুলেফেঁপে ওঠা এই তিনজনের বিপুল সম্পদের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে সিআইডি। পাশাপাশি তাদের সহযোগীদের তথ্যও মিলেছে।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার বিপরীতে একটি বাড়ির মালিক মো. সাইফুদ্দিন। মোহাম্মদ নগর হাউজিং এলাকায় তাঁর আরেকটি সোনালি রঙের বাড়ি রয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
এদিকে নগরীর মধ্যম রামপুরা বৌবাজারে আট গণ্ডা জমির ওপর ১০ তলা বাড়ি তৈরি করছেন দুই ভাই জাহাঙ্গীর ও সায়েমগীর। বাড়িটির চারদিক সিসিটিভি ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কর্মচারী রাজ্জাক জানান, এই বাড়ির বাজারমূল্য ১৫ কোটি টাকা। এছাড়া রামপুরা আবাসিকে তাদের আরও পাঁচতলা একটি ভবন রয়েছে। যার মূল্য অন্তত ৪ কোটি টাকা।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, সাইফুদ্দিনের নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। তবে তাঁর দুই ভাই মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। দুবাই ও ওমান থেকে স্বর্ণ চোরাচালান করেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বায়েজিদ এলাকায় তাঁর দুটি ‘গোল্ডেন বাড়ি’ রয়েছে।
সিআইডির তদন্তে আরো জানা গেছে, চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে মোবাইল অ্যাক্সেসরিজ ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালান করে আসছিলেন জাহাঙ্গীর ও সায়েমগীর। এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নই। মোবাইল এক্সেসরিজ ব্যবসা করেই সম্পদের মালিক হয়েছি।’ আরেক অভিযুক্ত মো. সাইফুদ্দিন বলেন, ‘আমি কী ব্যবসা করি, তা আপনাকে বলতে হবে কেন? স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’
পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের প্যারামাউন্ট সিটি মার্কেটের চতুর্থ তলায় ‘সানজিদা ইলেকট্রনিক্স’ নামে একটি দোকান রয়েছে। এখান থেকে মোবাইল অ্যাক্সেসরিজ ব্যবসার ছদ্মাবরণে জাহাঙ্গীর ও সায়েমগীর স্বর্ণ চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দুবাই ও চট্টগ্রামে তাদের বিশাল সিন্ডিকেট রয়েছে। যেখানে বিদেশি মুদ্রাও পাচার করা হতো। তাদের এই চক্রে আরো কয়েকজন পেশাদার স্বর্ণ চোরাচালানকারী রয়েছেন। যাদের মধ্যে অন্যতম মিজানুর রহমান, সোহেল ও হাসেম।
প্যারামাউন্ট সিটি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নওশাদ আলম বলেন, ‘মার্কেটের ব্যবসায়ী হিসেবে তাদের চিনতাম, তবে স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত ছিলেন বা আছে তা জানা ছিল না। সিআইডির কাছ থেকে বিষয়টি শুনেছি।’
তদন্তে জানা যায়, জাহাঙ্গীর তিন বছরে ২৬ বার দুবাই গেছেন। যার জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকা বিমান ভাড়া ব্যয় হয়েছে। সায়েমগীর গেছেন ১০ বার, বিমান ভাড়া ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ টাকা। তাদের সিন্ডিকেটের সদস্য মিজানুর রহমান তিন বছরে ২২ বার এবং সোহেল পাঁচ বছরে ৩৭ বার দুবাই-বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেছেন। প্রত্যেকবারই তারা দেশে স্বর্ণবার নিয়ে আসতেন।
২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর সোহেল দুবাই থেকে দেশে ফেরার সময় ২৬ পিস স্বর্ণবার, ৩ পিস স্বর্ণপিণ্ড, ৬ পিস স্বর্ণপাত ও স্বর্ণালংকারসহ চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে ধরা পড়েছিলেন। জব্দ স্বর্ণের বাজারমূল্য ছিল ২ কোটি ৯১ লাখ ১৩ হাজার টাকা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মো. সাইফুদ্দিনের কোনো নির্দিষ্ট পেশা ছিল না। রাতারাতি ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১৭ সালে তাঁর কাছ থেকে ৬০ পিস স্বর্ণবার জব্দ করা হয়, যার বাজারমূল্য ছিল ৩ কোটি টাকা। সাইফুদ্দিন মূলত রাউজানের গহিরা এলাকার বাসিন্দা এবং মৃত ইদ্রিস সওদাগরের ছেলে।
সিআইডি এই স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য তদন্ত চলছে।

