দেশের বাইরে থাকা প্রিয়জনদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাঠানো কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিস আনা প্রবাসীদের কাছে সাধারণ ঘটনা। বিদেশি সাবান, শ্যাম্পু, শিশুদের জুতা, খাদ্যপণ্যসহ নানা সামগ্রী দেশে পাঠান তারা, যা অনেক সময় অপরিচিত বাংলাদেশিদের মাধ্যমে আসে। তবে এসব সাধারণ বিষয়কে ঘিরেই ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীরা নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমস কর্মকর্তারা এসব ব্যক্তিগত পণ্যকে বাণিজ্যিক ঘোষণা দিয়ে শুল্ক আদায়ের চেষ্টা করেন, যা এক ধরনের হয়রানি। সম্প্রতি কাতারপ্রবাসী শ্রমিক রাশেদুল ইসলাম পরিবারের জন্য কিছু খাদ্য ও ব্যবহার্য পণ্য পাঠান মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা জামান হোসেনের মাধ্যমে। ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে জামানের কাছে থাকা এসব পণ্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আটক করে। লিখিত ব্যাখ্যায় পণ্যগুলোকে বাণিজ্যিক আমদানি বলে দাবি করা হয় এবং ২০ হাজার টাকার বেশি শুল্ক দাবি করা হয়, যদিও পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ২৫ হাজার টাকা। অতিরিক্ত শুল্ক দিতে অস্বীকৃতি জানালে কাস্টমস কর্মকর্তারা পণ্য জব্দ করে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বিমানবন্দরে যাত্রী ও আমদানিকারকদের ওপর কাস্টমস কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার ব্যাপকভাবে চলছে। অনেকে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়ে পণ্য ছাড়িয়ে আনেন, অন্যথায় অস্বাভাবিক হারে শুল্ক গুনতে হয়। বিশেষজ্ঞদের দাবি, বিদ্যমান ব্যাগেজ রুল অনুযায়ী এই ধরনের ব্যক্তিগত পণ্য বাজেয়াপ্ত করার কোনো সুযোগ নেই। এটি সুস্পষ্ট হয়রানির উদাহরণ, যেখানে অনানুষ্ঠানিক করের মাধ্যমে অনৈতিক উপার্জনের পথ তৈরি করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কাস্টমস সদস্য মো. লুৎফর রহমান বলেন, “ব্যক্তিগত ব্যবহারের পণ্যকে বাণিজ্যিক দেখিয়ে আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রবাসীরা।”

কাস্টমসের ব্যাখ্যায় বলা হয়, গ্রিন চ্যানেল দিয়ে কোনো ঘোষণা না দিয়ে পার হওয়ার সময় স্ক্যানিং করে জামানের কাছে ১৮ কেজি খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়, যা তাঁকে সন্দেহভাজন করে তোলে। তাঁকে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। তবে জামানের দাবি, এসব পণ্য তাঁর এক পরিচিত প্রবাসী তাঁর পরিবারের জন্য পাঠিয়েছিলেন। একই ফ্লাইটের আরও অন্তত ২০ জন যাত্রীর ব্যাগ খুলে দেখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ সংক্রান্ত ছবি ও তথ্যেও দেখা গেছে, জব্দকৃত পণ্যের মধ্যে শিশুদের জুতা, দুধ, খেলনা, সাবান, শ্যাম্পু, খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ছিল। এ ঘটনায় কাতার থেকে পণ্য পাঠানো রাশেদুল ইসলাম বলেন, “রমজান উপলক্ষে পরিবারের জন্য কিছু খেজুর ও বাচ্চাদের খেলনা পাঠিয়েছিলাম। এগুলো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বাণিজ্যিক নয়।”
২০২৪ সালের ব্যাগেজ বিধিমালা অনুযায়ী, একজন যাত্রী নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য, পরিধেয় ও ব্যক্তিগত সামগ্রী আনতে পারেন। অথচ এসব নীতিমালা উপেক্ষা করেই শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। এনবিআরের সাবেক কাস্টমস সদস্য লুৎফর রহমান বলেন, “কাস্টমস কর্মকর্তারা যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জন্য নিয়মের অপব্যাখ্যা করছেন।” বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির আরও নানা অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি এক যাত্রী ৪ কেজি পেস্তা বাদাম আনায় তাঁকে ২৫ হাজার টাকা শুল্ক দিতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে, এক সাংবাদিক জানান, তল্লাশির নামে তাঁকে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা হয়। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর ছাড়া পেলেও সাধারণ যাত্রী হলে হয়রানির শিকার হতে হতো বলে মনে করেন তিনি।
ঢাকা কাস্টমস হাউজের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এসব পণ্য বাণিজ্যিক নয়, বরং ব্যক্তিগত ব্যবহারের। কেন এগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করা হলো, তা বুঝতে পারছি না।” তবে কাস্টমস কমিশনার মো. জাকির হোসেন বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ কমে আসছে। আলোচ্য ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে।”
এদিকে আমদানিকৃত পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করে শুল্ক আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী সোলাইমান পার্সি ফয়সাল জানান, কাস্টমস কর্মকর্তারা আমদানিকৃত পণ্যের প্রকৃত দামের চেয়ে ৬৩ শতাংশ বেশি মূল্য নির্ধারণ করে শুল্ক আদায় করছেন।
এ ধরনের অভিযোগ একাধিক আমদানিকারকের কাছ থেকেও এসেছে। অনেক ব্যবসায়ী জানান, কাস্টমস কর্মকর্তারা বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত শুল্ক ধার্য করেন, যা বৈধ ব্যবসাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিজিএমইএসহ বিভিন্ন সংগঠন এনবিআরকে এ বিষয়ে অভিযোগ জানালেও সমস্যার সমাধান মেলেনি।
সার্বিকভাবে, প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের এই হয়রানি দূর করতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। বিমানবন্দরে যাত্রীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলেও কাস্টমস কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত ক্ষমতা চর্চা সেই প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

