আশিকুর রহমান লস্কর, চট্টগ্রামের এক ‘অখ্যাত’ ব্যবসায়ী, যার নাম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপকভাবে আলোচিত। ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের মাধ্যমে সে বিদেশে নির্মাণ করেছে একাধিক সম্পদ। বিশেষ করে দুবাইয়ে যেখানে তার নামের অধীনে ৬২টি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও ভিলা রয়েছে।
দুবাইয়ের স্থানীয় সম্পত্তি তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মালিক হিসেবে তার নাম উঠে এসেছে। শুধু দুবাই নয় কানাডাতেও তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে তার। ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তিনি এসব সম্পত্তি কিনেছেন যা মূলত দেশ থেকে পাচার করা অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে।
এই অপরাধের মূল কৌশল ছিল পুরোনো জাহাজ আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার। আশিকুর রহমান লস্কর একটি জটিল চাতুরির মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করেছেন। তার দ্বারা পাচার করা অর্থ প্রথমে চলে যায় ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, পানামা, লাইবেরিয়া এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের বিভিন্ন কোম্পানিতে যা করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত। এরপর এই অর্থ স্থানান্তরিত হয় দুবাই ও কানাডায়। তাঁর এই অপরাধে অংশীদার ছিলেন বেসরকারি এবি ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ব্যাংক ঋণের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ার ঘটনা ২০২০ সালে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে।
আর্থিক দুর্নীতির তদন্তের জন্য বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) ২০১৮ সালে দুদককে লস্করের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লস্করের মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানি নিয়মের তোয়াক্কা না করে দেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর করেছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে তার নাম সরকারী কোনো তদন্ত তালিকায় আসেনি। যদিও দেশের অর্থনৈতিক দুষ্টু চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক সরকারি অনুসন্ধানী দল কাজ শুরু করেছিল তবুও লস্কর এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
আশিকুর রহমান লস্কর একজন ব্যবসায়ী যিনি তার ব্যবসার শুরু করেছিলেন ২০০৬ সালে। তার পিতামহ আতিউর রহমান লস্কর মেরিন সার্ভেয়ার হিসেবে কাজ করতেন এবং পরে ব্যবসার দিকে মনোনিবেশ করেন। আশিকুর, তার বাবার ব্যবসা চালিয়ে গিয়েও বৈধ উপায়ে নয় বরং একাধিক ভুয়া নথি তৈরি করে সেগুলি দিয়ে অর্থ আত্মসাতের পথে হাঁটেন। তিনি চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ রেখে ব্যাংক থেকে সুবিধা গ্রহণ করতেন। ২০১৩ সালে তিনি মেঘনা ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকও ছিলেন। ২০২৩ সালের ৫ মার্চ তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং তিনি ৬ মার্চ দুবাই হয়ে কানাডা পালিয়ে যান।
লস্করের জাহাজ আমদানির বিষয়ে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, তিনি মাহিন এন্টারপ্রাইজ, এআরএল শিপ ব্রেকিং, এবং গ্র্যান্ড ট্রেডিংয়ের নামে বেশ কয়েকটি ঋণপত্র খুলেছিলেন এবি ব্যাংক থেকে। ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ১৮টি পুরোনো জাহাজের এলসি খোলা হয়েছিল এবং এর মধ্যে পাঁচটি জাহাজের জন্য অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। এর পরবর্তী সময়ে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আরো ১৫টি এলসি খোলা হয় এবং সেগুলোর বিপরীতে আরও বিশাল পরিমাণে ফোর্স ঋণ সৃষ্টি করা হয়।
এছাড়া তিনি বেনামি কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে ৫ কোটি ২৮ লাখ ডলার পাচার করেছিলেন। সেসব কোম্পানি যা করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত তাদের কাছ থেকে যেসব জাহাজ আমদানি দেখানো হয়েছিল তা ছিল একাধিক অসঙ্গতিপূর্ণ এবং সন্দেহজনক। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোও লস্করের কোম্পানির নাম কোনো রকমের নিবন্ধন ছাড়াই আমদানি কার্যক্রম চালাতে সহযোগিতা করেছিল।
অথচ, কিছু রহস্যময় জাহাজ আমদানির মধ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিষ্ঠান নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল যেখানে প্রমাণ মেলে যে, লস্কর এবং তার সহযোগীরা একের পর এক জালিয়াতি করে যাচ্ছিল। এসব অভিযোগের মধ্যেও আশ্চর্যজনকভাবে সরকারি কোনো উদ্যোগের মধ্যে তার নাম রাখা হয়নি। অথচ তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অর্থনৈতিক খাতে তোলপাড় সৃষ্টি করে যাচ্ছিলেন।
দেশের ব্যাংকিং খাতে বিশেষ করে এবি ব্যাংক ও তার শাখাগুলোর মধ্যে যেভাবে নিয়ম ভেঙে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল এবং সেগুলোর বিপরীতে দেশে অর্থ পাচারের যে বড় চিত্র উঠে এসেছে তা একদিকে যেমন ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা তুলে ধরে তেমনি সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও নির্দেশ করে।

