চট্টগ্রামের অখ্যাত ব্যবসায়ী আশিকুর রহমান লস্কর বিদেশে বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছেন। তিনি বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে এ কাজটি করেছেন। সমকাল অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর পেছনে ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার যোগসাজশ ছিল। সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন এবি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মসিউর রহমান চৌধুরী। আশিকুর রহমানের বড় ধরনের দুর্নীতি হতে মসিউরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল।
বিদেশে অর্থ পাচার করে অপরাধীরা অবৈধ উপার্জন নিরাপদে রাখে এবং কর ফাঁকি দেয়। বাংলাদেশে বর্তমানে দেশে বাইরে বাড়ি বা গাড়ি কেনার জন্য অনুমোদন লাগে। ব্যবসায়িক কাজে বিদেশে অর্থ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি প্রয়োজন। তবে মসিউর কখনোই এই অনুমতি নেয়নি। সমকালের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঋণগ্রহীতাদের থেকে উৎকোচ নিয়েই মসিউর তার সম্পদ গড়েছেন।
২০১৭ সালের মে মাসে মসিউর এবি ব্যাংকের এমডি হন। তার বেপরোয়া কার্যকলাপে ২০১৮ সালে তিনি পদত্যাগ করেন এবং অস্ট্রেলিয়া চলে যান। তার চাকরি শুরু হয়েছিল সোনালী ব্যাংক থেকে। পরবর্তীতে তিনি ২০০৩ সালে এবি ব্যাংকে যোগ দেন। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এবি ব্যাংকে একাধিক অনিয়ম ঘটেছে। তার নেতৃত্বে আশিকুর রহমান লস্করকে ১ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এ ঋণটি মসিউরের বিশেষ সহায়তায় অনুমোদন হয়েছিল। এছাড়া, পলাতক ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু এবি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছিলেন।
মসিউর রহমান চৌধুরী ও তার স্ত্রী ফারজানা চৌধুরী বিদেশে এই অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগী। তাদের অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া যায়নি। আগে দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া দিয়ে এই অর্থ অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছে। অর্থের উৎস গোপন করার জন্য মসিউর এভাবে টাকা পাচার করেছেন। এসব সম্পত্তি বিদেশে তারা ল ফার্মের নামে কিনেছেন। ফলে সম্পত্তির প্রকৃত মালিক চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অস্ট্রেলিয়ায় মসিউরের পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য আইনি সহায়তা চেয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি সংস্থা ২০১৭ সালে মসিউরের চারটি বাড়ি ও একটি কোম্পানির তথ্য জানিয়েছিল। এই বাড়িগুলো ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কেনা হয়েছিল। এসব বাড়ির বর্তমান বাজারদর প্রায় ৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া, মসিউর ও তার স্ত্রীর নামে দুটি কোম্পানি ছিল, যেগুলোর মাধ্যমে তারা এসব সম্পত্তি কিনেছিলেন।
এটি ছিল ২০১৫ সালের ৩০ অক্টোবর মসিউরের নামে ‘ফার্মোশ ট্রেডিং পিটিওয়াই লিমিটেড’ নামে কোম্পানি খোলা হয়। এর আগে আরো দুটি কোম্পানি খোলা হয়েছিল। প্রথমটি ছিল ‘ইনস্টার ইনভেস্টমেন্ট হোল্ডিংস পিটিওয়াই লিমিটেড’। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে মসিউরের স্ত্রী ফারজানা চৌধুরীর নামে ‘ভাইব টেক অস্ট্রেলিয়া প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক কোম্পানি নিবন্ধিত হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বাড়িগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দামি ছিল লাকেম্বা স্ট্রিটের ১৮৮ নম্বর বাড়িটি। এটি ২০১৫ সালে ৪৩ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারে কেনা হয়েছিল। বর্তমানে এ বাড়িটি ৫৫ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারে বিক্রি করা হচ্ছে। এর বাইরে আরো দুটি বাড়ি লাকেম্বা বুলেভার্ডে কেনা হয়েছিল। এই বাড়িগুলো বর্তমানে বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, মসিউর রহমান চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি কেনার জন্য একাধিক আইনজীবী ব্যবহার করেছেন। এসব বাড়ির মালিকানা খুঁজে বের করা বেশ জটিল কাজ, কারণ এগুলো কোম্পানির নামে কিনেছিলেন। এসব সম্পত্তি কিনে মসিউর অর্থ পাচারের কাজ চালিয়ে গেছেন।
এবি ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, একসময় এবি ব্যাংক দেশের অন্যতম সেরা ব্যাংক ছিল। তবে বর্তমানে ব্যাংকটি ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। ব্যাংকটির ৩২ হাজার কোটি টাকার প্রায় অর্ধেক ঋণ এখন খেলাপি। বিভিন্ন দুর্নীতির কারণে এবি ব্যাংক বর্তমানে সংকটের মধ্যে রয়েছে। ২০২০ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবি ব্যাংকের অফশোর ইউনিটের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা করেছিল।
এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক বলেন, “মাহিন ট্রেডার্স ছিল দেশের অন্যতম বৃহত্তম ব্যবসায়ী। তবে আমি কখনও তার থেকে কোনো সুবিধা নেইনি।” মসিউর রহমানের জালিয়াতির বিষয়টি ২০১৮ সালে দুদকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে ওঠে আসে। সেখানে বলা হয়, ব্যাংকের ঋণ বিভাগের কর্মকর্তারা মিলে ঋণগ্রহীতাদের অবৈধভাবে ঋণ বিতরণ এবং অর্থ পাচার করেছে।
মসিউর রহমান চৌধুরী, যে ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া চলে গিয়েছিলেন, এই অর্থ পাচারের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “এবি ব্যাংক থেকে আমি অস্ট্রেলিয়ায় পিআরের জন্য কিছু অর্থ দেখাতে বাধ্য হয়েছিলাম। তবে ইনস্টার ইনভেস্টমেন্টের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “এমডির দায়িত্ব ছিল ব্যাংকটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। কিন্তু তিনি যদি অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, তবে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

