হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার ছিল কেদারাকোর্টে অবস্থিত বাল্লা স্থলবন্দর। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের প্রত্যাশা ছিল, এ বন্দর চালু হলে বদলে যাবে এলাকার অর্থনীতি। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অসহযোগিতায় সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়ার পথে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ অলাভজনক হওয়ায় কয়েকটি স্থলবন্দর বন্ধের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাল্লা স্থলবন্দর। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের যাচাই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অংশে অবকাঠামো তৈরি হলেও ভারতের অংশে কোনো সুবিধা গড়ে ওঠেনি। ফলে কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। কমিটি পরামর্শ দিয়েছে, ভারতের অংশে উন্নয়ন না হওয়া পর্যন্ত বন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখা যেতে পারে।
১৯৫১ সালে মাত্র ৪.৩৭ একর জমিতে বাল্লা স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে এ বন্দরের আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন আগের জায়গা থেকে ২ কিলোমিটার পশ্চিমে কেদারাকোর্টে ১৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় আধুনিক স্থাপনা। যার মধ্যে রয়েছে ওয়্যারহাউজ, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড, ট্রাক পার্কিং ইয়ার্ড, ওপেন ইয়ার্ড, প্রশাসনিক ভবন ও ডরমিটরি।
২০১৬ সালের ২৩ মার্চ নতুন স্থানে বন্দরের কাজ শুরু হয়, যা শেষ হয় ২০২৩ সালের জুনে। এরপর বাল্লা স্থলবন্দরকে দেশের ২৩তম স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী এবং তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব অশোক মাধব রায়ের উদ্যোগে এটি স্থলবন্দর হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বাংলাদেশ সরকার বন্দরের উন্নয়ন করলেও ভারতের পক্ষ থেকে সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে বন্দরের কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়রা বলছেন, উন্নত অবকাঠামো থাকার পরও ভারতের অনাগ্রহের কারণে এই স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটতে যাচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সভায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিগত সরকারের সময় অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। যা দেশের জন্য তেমন কোনো সুফল বয়ে আনেনি। সরকার কেবল সচল ও লাভজনক স্থলবন্দরগুলোকেই টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাল্লা স্থলবন্দর এলাকার শতাধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করে নতুন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। কিন্তু এখনো অনেকেই তাদের পুরো ক্ষতিপূরণ পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, বর্তমানে ১৬টি পরিবার বন্দরের সীমানার মধ্যে বসবাস করছে। বন্দরের ভেতরে গরু-বাছুর চরানো হচ্ছে। আর পাহারায় মাত্র একজন আনসার সদস্য। ফলে বন্দরের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের আরেকটি অভিযোগ, বন্দরের সম্ভাবনা দেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কিছু আওয়ামী লীগ নেতা সিন্ডিকেট করে আশপাশে কয়েক একর জমি কিনেছিলেন। কিন্তু বন্দর চালু না হওয়ায় সেই জমি এখন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। চড়া দামে বিক্রি করাও সম্ভব হচ্ছে না।
এর ভবিষ্যৎ কী?
চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি শেষ। কিন্তু ভারতের অংশে অবকাঠামো না থাকলে বন্দর চালু করা সম্ভব নয়। ভারত যদি আগ্রহ না দেখায়, তাহলে এই স্থলবন্দর কোনো কাজে আসবে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ চান, বন্দরটি চালুর জন্য দুই দেশের সরকার আন্তরিক উদ্যোগ নিক। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা এই স্থাপনা অব্যবহৃত পড়ে থাকবে। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতির কারণ হবে।

