বাংলাদেশের পরিবহন খাতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করা খন্দকার এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ব্যাপক অনুসন্ধান চালাচ্ছে। বিতর্কিত পরিবহন ব্যবসায়ী ও এনা পরিবহনের মালিক এনায়েত উল্লাহ একসময় ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর এই ব্যক্তি টানা ১৫ বছর দেশের সড়ক-মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি পলাতক রয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধানে নেমেছে। সংস্থাটির তদন্তে জানা গেছে, এনায়েত উল্লাহর ৪০টি ব্যাংক হিসাবে ১২৫ কোটি ৭২ লাখ ২৯ হাজার ২৮০ টাকা জমা রয়েছে। যার বেশিরভাগই তার ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাব।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এনায়েত উল্লাহর নামে ৭০টি, স্ত্রী নার্গিস সামসাদের নামে ১০টি, মেয়ে চাশমে জাহান নিশির নামে তিনটি এবং এনা ট্রান্সপোর্ট নামের ১৫২টি পরিবহনসহ মোট ২৩৫টি বাসের মালিকানার প্রমাণ মিলেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এসব সম্পদ গোপনে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছে।
এক দুদক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এনায়েত উল্লাহ ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থ সরিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে। তারা মালিকানায় থাকা গাড়িগুলোও বিক্রির চেষ্টা করছেন। এজন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শিগগিরই তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করা হতে পারে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এনায়েত উল্লাহ, তার স্ত্রী, ছেলে রিদওয়ানুল আশিক নিলয় ও মেয়ে চাশমে জাহান নিশির বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদকের সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলম এ নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন।
২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে এনায়েত উল্লাহ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তিনি তখন পার পেয়ে যান। পরে ২০২১ সালের ১৪ জুন দুদক তাকে সম্পদের হিসাব দিতে নোটিশ পাঠায়।
ওই বছরের অক্টোবরে জমা দেওয়া বিবরণীতে তিনি ২১৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকার সম্পদের ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, এসব সম্পদ তিনি এনা ট্রান্সপোর্ট, সোলার এন্টারপ্রাইজ, এনা শিপিং, এনা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি থেকে আয় করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এনায়েত উল্লাহর ব্যাংক হিসাবে রয়েছে—
- ব্যাংক এশিয়া (বিএসএমএমইউ শাখা): ৩.৯২ কোটি টাকা
- সিটি ব্যাংক (প্রিন্সিপাল শাখা): ৫৮.৯৭ লাখ টাকা
- ব্র্যাক ব্যাংক: ১০.২০ কোটি টাকা (সঞ্চয়ী হিসাব)
- স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক: ৩৫.৫৫ কোটি টাকার এফডিআর
- সাউথইস্ট ব্যাংক: ২.৭০ কোটি টাকা
- এনআরবিসি ব্যাংক: ১.১৪ কোটি টাকা
- এনা মোটরস (ব্যাংক আল-ফালাহ, ধানমন্ডি শাখা): ২১.২৮ কোটি টাকা
এছাড়া তার প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক আল-ফালাহর বিভিন্ন হিসাবে আরও প্রায় ২৫ কোটি টাকা জমা রয়েছে।
এনায়েত উল্লাহর সম্পদের মধ্যে রয়েছে-
- মিরপুরে ৮.২৫ বিঘা জমিতে ছয়তলা বাড়ি।
- ধানমন্ডির ১১ নম্বর রোডে ৩,০৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট।
- বসুন্ধরা সিটিতে ১৫১ বর্গফুটের দোকান।
- কেরানীগঞ্জে ৪০ কাঠা জমি।
- গাজীপুরে তিন কোটি ৬০ লাখ টাকার জমি।
- ফেনীতে ১২ শতাংশ জমি।
তার স্ত্রী নার্গিস সামসাদের নামে উত্তরায় তিন কাঠার প্লট ও ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট রয়েছে। ছেলে রিদওয়ানুল আশিকের নামে গুলশানে ৩২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, মিরপুর বেড়িবাঁধে ১০৯ শতাংশ জমি এবং উত্তরায় পাঁচ কাঠার প্লট রয়েছে। মেয়ে চাশমে জাহানের নামে গুলশানে ৩২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ও বাড্ডার কাঁঠালদিয়ায় পাঁচ কাঠা জমির তথ্যও মিলেছে।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানিয়েছেন, ‘অনুসন্ধান শুরু হয়েছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কমিশন সিদ্ধান্ত নিলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।’
দুদক আরও বলছে, এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিদিন এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্তাধীন। তিনি ও তার পরিবার বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন এবং এখন বিদেশে পালানোর চেষ্টা করছেন। এ কারণে তাদের সম্পদ জব্দের পাশাপাশি বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
দুদক এখন দ্বিতীয় দফার অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, এনায়েত উল্লাহর সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। তাই আরও গভীর তদন্ত প্রয়োজন। যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি অবৈধ উপায়ে সম্পদ গড়েছেন। তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

