স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণ ও নিরাপদ আবাসনের লক্ষ্যে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। ২০১০ সালের পর থেকে দেশের ১৯টি জেলা ও ছয়টি উপজেলায় মোট ৩৫টি প্লট ও ফ্ল্যাট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সংস্থাটি। কিন্তু প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের আবাসন নিশ্চিত করা। অথচ বাস্তবে তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবশালীদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্র।
সরকারি নথিপত্র ও সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকার বাইরে নেওয়া প্রকল্পগুলোর ২০ শতাংশের বেশি প্লট ও ফ্ল্যাট চলে গেছে স্থানীয় এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের দখলে। বরাদ্দের তালিকা প্রভাবিত করে আত্মীয়স্বজন, দলীয় নেতাকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের নামে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারাও বিশেষ কোটায় প্লট পেয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ে গড়ে ওঠা এসব প্রকল্প আসলে ক্ষমতাসীনদের ‘আওয়ামী পল্লি’ হিসেবে পরিণত হয়েছে।
গত ১০ বছরে জাগৃকের সমাপ্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৩৪টি প্লট-ফ্ল্যাট প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯০টি প্লট ও ২ হাজার ৪৫৯টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন কোটার আওতায় প্লট বরাদ্দের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির জন্য বরাদ্দ সংরক্ষিত থাকলেও অধিকাংশ প্লট ক্ষমতাসীনদের অনুগতদের দখলে চলে গেছে।
শিবচর উপজেলায় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নেওয়া প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই স্থানীয় সংসদ সদস্য নূর-ই-আলম চৌধুরীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বিতরণ করা হয়েছে। ‘দাদাভাই উপশহর সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে গড়ে ওঠা ৪৮ একর জায়গার একটি প্রকল্প তার বাবা ইলিয়াস আহম্মেদ চৌধুরীর নামে করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ৪৫২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। যার মধ্যে ৯৮টি সংরক্ষিত কোটায়। একইভাবে শিবচরের আরও কয়েকটি আবাসন প্রকল্পেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের প্রভাব রয়েছে। এমনকি প্রকল্পের জন্য নদীর জায়গা ভরাট করেও প্লট তৈরি করা হয়েছে। একসময় স্রোতস্বিনী থাকা ময়নাকাটা নদী এখন শুকিয়ে গেছে।
শিবচরের এক শতবর্ষী বাসিন্দা এমারত মোল্লা জানান, ‘১০ বছর আগেও এখানে নদী ছিল, নৌকা চলত। এখন সেটা বোঝার উপায় নেই।’
গোপালগঞ্জ হাউজিং এস্টেট প্রকল্পে ১৭২টি প্লটের মধ্যে ৪৩টি সংরক্ষিত কোটায় বরাদ্দ দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এগুলোও রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ব্যক্তিগত সহকারী, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, ছাত্রলীগ নেতা, এমনকি দুই পুলিশ কর্মকর্তাও এই বরাদ্দের সুবিধাভোগী হয়েছেন।
তথ্য বলছে, জাগৃকের কর্মকর্তারা এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই প্লট বরাদ্দ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ছিল লোক দেখানো। ক্ষমতাসীনদের পছন্দের ব্যক্তিদের নাম তালিকায় ঢুকিয়ে বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। এমনকি সাধারণ মানুষ বরাদ্দ পেলেও তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালে মোহাম্মদপুরের ডি-টাইপ কলোনির ২৮৮টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে নতুন প্রকল্প নেওয়া হলেও তাদের বরাদ্দ না দিয়ে দলীয় অনুগতদের জন্য প্লট সংরক্ষিত রাখা হয়। এই এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বসবাস থাকায় স্থানীয়রা একে ‘আওয়ামীপল্লি’ বলেই চেনেন।
জাতীয় গৃহায়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নুরুল বাসির স্বীকার করেছেন, ‘সরকারি প্রকল্পের প্লট ব্যক্তির নামে নেওয়া হয়েছে, এ নিয়ে অভিযোগ আছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে বরাদ্দ বাতিল হতে পারে।’ তবে তিনি দাবি করেন, কর্মকর্তাদের কেউ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে জাতীয় গৃহায়নের যুগ্ম সচিব এস এম সোহরাব হোসেন বলেন, ‘আইন মেনেই প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি প্রকল্প কোনো ব্যক্তির নামে হওয়া উচিত নয়। নাম পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।’
সরকারি উদ্যোগে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসন নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশেষ মহলের জন্য সুবিধা তৈরির এক মডেলে। গৃহায়ন প্রকল্পগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছামতো বরাদ্দ, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি প্রকল্পগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ বরাদ্দের সুযোগ খুবই কম পেয়েছেন বরং ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরাই প্রকল্পগুলোর মূল সুবিধাভোগী। ফলে সরকারি উদ্যোগে গৃহায়নের যে উদ্দেশ্য, তা ব্যাহত হয়েছে।

