গত জুলাই মাসের শেষ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনের মধ্যে তিনটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এমডি মোশাররফ হোসেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকরা জানিয়েছেন, ৩০ জুলাই মোশাররফ হোসেন পদত্যাগ করার এক দিন আগে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান তাকে ডেকে বলেন, “আপনি আজকেই পদত্যাগ করে অফিস ত্যাগ করবেন।”
মোশাররফ হোসেন তখন বলেন, “আজকের সময় একটু দেরি হয়ে গেছে। তবে আমি আপনার নির্দেশের বাইরে যাব না। আগামীকালই পদত্যাগপত্র জমা দেব।”
মোশাররফ হোসেনের পদত্যাগ ব্যাংকিং খাতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরবর্তীতে একটি বিশেষ পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিবেদনে উঠে আসে, ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ দৈনন্দিন কাজকর্মে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করছে।
নতুন পর্ষদে আতাউর রহমান চেয়ারম্যান এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি মহসিন মিয়া নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হন। এছাড়া শেখ আশ্বাফুজ্জামান অডিট কমিটির চেয়ারম্যান হন। পর্ষদে আরও দুই সদস্য পূর্ব থেকেই ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, নতুন পর্ষদ ঋণ কার্যক্রম, নিয়োগ, বদলি এবং শাস্তিসহ সব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করত। কর্মকর্তাদের কক্ষে ডেকে অশালীন ভাষায় নির্দেশ দেওয়া হতো। এমডির অভিযোগ, এই হস্তক্ষেপই পদত্যাগের মূল কারণ।
মোশাররফ হোসেন এই বছরের ১৬ জানুয়ারি এমডি হিসেবে যোগ দেন এবং ৩০ জুলাই পদত্যাগ করেন। এই সময়ে তার মোট কর্মদিবস ছিল ১২৬ দিন।
অন্য একটি বড় বিষয় ছিল সুরুজ মিয়া স্পিনিং মিলসের ৪৮ কোটি টাকা সুদ মওকুফের বিরোধ। এমডি আপত্তি জানান, কারণ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের পূর্বের সম্পর্ক ছিল।
কোম্পানি সচিব জানিয়েছেন, পর্ষদ এমডিকে বিভিন্ন বিষয়ে চাপ দিত, এমনকি কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করে নিজের পছন্দমতো নিয়োগ দেওয়ার জন্যও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চেয়ারম্যান ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ব্যাংকের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। তাই তাদেরকে পর্ষদ কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
সাময়িক চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং ব্যাংকের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একজন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা মনোনীত করারও প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া এমডিকে দ্রুত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান আতাউর রহমান লিখিতভাবে জানিয়েছেন, এমডি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছেন, পর্ষদ কখনো চাপ দেয়নি। এমডি ব্যাংক পরিচালনায় ব্যর্থ ও অদক্ষ ছিলেন।
২৯ জুলাই বৈঠকে সুরুজ মিয়া স্পিনিং মিলের ৮৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৪৮ কোটি টাকার সুদ মওকুফে এমডি আপত্তি জানান। এতে চেয়ারম্যান ক্ষিপ্ত হন। পরিদর্শন টিমের অডিও যাচাইতে দেখা গেছে, এমডি গ্রাহক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে চেয়ারম্যানের সরাসরি যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক প্রধানদের সঙ্গে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন।
পরিচালকরা পরামর্শ দেন, সরাসরি পদত্যাগ করলে গভর্নরের কাছে অভিযোগ হতে পারে। তবে শেষপর্যন্ত চেয়ারম্যান আতাউর রহমান এমডিকে বলেন, “আজকেই পদত্যাগ করে অফিস ছাড়বেন।” পরদিন এমডি পদত্যাগপত্র জমা দেন।
মোশাররফ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করছে। আমাকে নানা বিষয়ে চাপ দেওয়া হতো। পর্ষদ পদত্যাগ করতে বলেছিল। আমি পদত্যাগ করেছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করব।”
এ বিষয়ে চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

