দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ বিভাগের ‘মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পে’ ২৪৮ কোটি টাকা নয়ছয়ের প্রমাণ পেয়েছে। প্রকল্প পরিচালনা থেকে শুরু করে ঠিকাদার নিয়োগ, কৃষকদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়—সবক্ষেত্রেই অনিয়মের ছবি উঠে এসেছে দুদকের অনুসন্ধানে।
প্রকল্পটি ২০২০-২১ অর্থবছরে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চলে চালু করা হয়েছিল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। কাগজে-কলমে বলা হয়েছে, প্রকল্পের অগ্রগতি ৭০–৭৫ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে কাজের অগ্রগতি খুবই কম। ভুয়া বিল ও ভাউচার তৈরি, নিন্মমানের কাজ, কৃষকদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ এবং কমিশন বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে।
অভিযোগের তির বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক এমপি মাহবুব উল আলম হানিফ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের দিকে। সূত্র জানায়, দুদকের গোয়েন্দা অনুসন্ধানে অনিয়মের প্রমাণ মেলায় দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। টিম ইতোমধ্যেই নথিপত্র যাচাই-বাছাই শুরু করেছে। এর আগে দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে প্রাথমিক প্রমাণও মিলেছে। ১৩ জানুয়ারি কুষ্টিয়া দুদক কার্যালয় থেকে পরিচালিত অভিযানে ঠিকাদার নিয়োগ এবং সাবেক সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধান টিম প্রকল্পের নথিপত্র সংগ্রহ করছে, অভিযোগ-সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করছে এবং রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করছে। এরপর কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, “সেচ প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধান টিম কাজ শুরু করেছে। তারা নথিপত্র সংগ্রহ করছে। অভিযোগ-সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও রেকর্ডপত্র যাচাই শেষে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবে। এরপর কমিশন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।” সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ২৫, ২৬ ও ২৭ নভেম্বর দুদকে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে। মুজিবনগর সেচ প্রকল্পের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে বিএডিসির চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন খান ও জনসংযোগ কর্মকর্তা এম.এস. সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুদকের তলব তালিকায় ১৯ বিএডিসি কর্মকর্তা:
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্প সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৯ কর্মকর্তাকে তলব করেছে। তাদের প্রত্যেককে নির্ধারিত তারিখে হাজির হয়ে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২৫ নভেম্বর তলব করা হয়েছে কুষ্টিয়া রিজিয়নের কর্মকর্তাদের। এতে রয়েছেন সহকারী প্রকৌশলী এরশাদ আলী ও হাফিজ ফারুক, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মমিনুল ইসলাম, আদনান আল বাচ্চু, আসিফ মাহমুদ এবং আব্দুল্লাহ আল মামুন। পরের দিন, ২৬ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গা রিজিয়নের কর্মকর্তারা হাজির হবেন। তলব করা হয়েছে সহকারী প্রকৌশলী খালেদা ইয়াসমিন, উপ-সহকারী প্রকৌশলী দিদার-ই-খোদা, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুল হালিম, আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং হুমায়ুন কবিরকে।
২৭ নভেম্বর মেহেরপুর রিজিয়নের কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসবেন। এতে রয়েছেন সহকারী প্রকৌশলী শাহজালাল আবেদীন, মাযহারুল ইসলাম, শাহরিয়ার আহমেদ এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী লিমন হোসেন, ইকরামুল হক, শ্যামল হোসেন ও আশরাফুল ইসলাম।
বিএডিসি এই প্রকল্পের মাধ্যমে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের প্রায় ২১,৫০০ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে চেয়েছিল। বছরে ৫১ হাজার টন ধান, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য উৎপাদন লক্ষ্য করে ২৪৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকার পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। প্রকল্প সংক্রান্ত অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য দুদক কর্মকর্তাদের তলব করেছে যাতে প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা যায়।
মুজিবনগর সেচ প্রকল্পে ২৪৮ কোটি টাকার দুর্নীতি:
কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চলের প্রায় ২১,৫০০ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ‘মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্প’ বিএডিসি গ্রহণ করে। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে ২৪৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকার ব্যয় ধরা হয়। বছরে ৫১ হাজার টন ধান, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, কাগজে-কলমে প্রকল্পের অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ দেখানো হলেও বাস্তবে সিংহভাগ কাজ সম্পন্ন হয়নি। স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা বলেন, নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেট এবং প্রকল্প পরিচালকের যোগসাজশে বড় অংশের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল কাজের মধ্যে রয়েছে:
- ১৩০টি সৌরচালিত ডাগওয়েল নির্মাণ; প্রতিটির ব্যয় ১২ লাখ টাকা,
- ১৮০ কিমি খাল পুনঃখনন; প্রতি কিমি ৯ লাখ টাকা,
- ২৫৫টি পাম্প হাউজ নির্মাণ; প্রতিটির ব্যয় ১৫ লাখ টাকা,
- ৯৫টি ২ কিউসেক ফোর্সমোড পাম্প স্থাপন; প্রতিটির ব্যয় ১৫ লাখ টাকা,
- ২৫টি ৫ কিউসেক সোলার পাম্প; প্রতিটির ব্যয় ১৫ লাখ টাকা,
- ১৫টি বড় আকারের সেচ অবকাঠামো; প্রতিটির ব্যয় ৪০ লাখ টাকা,
- ১২০টি মাঝারি আকারের সেচ অবকাঠামো; প্রতিটির ব্যয় ২৫ লাখ টাকা,
- ৩০০টি ছোট আকারের সেচ অবকাঠামো; প্রতিটির ব্যয় ৭.৫ লাখ টাকা,
- ২১৫টি বিদ্যুৎ লাইন; প্রতিটির ব্যয় ৫ লাখ টাকা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মাঠপর্যায়েই এসব কাজের অনেকটাই হয়নি বা নিম্নমানের হয়েছে। ঠিকাদার মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকের ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দুই শতাধিক সেচ প্লান্টে স্থানীয় চাষীদের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কাজ না করেও ভুয়া বিল ও ভাউচার দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক ৪০ শতাংশ এবং ঠিকাদার ৬০ শতাংশ ভাগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ডিপিপিতে নির্ধারিত নকশা ও মান অনুযায়ী ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের সেচ অবকাঠামো নির্মাণ হয়নি।
দুদকের কুষ্টিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নীলকমল পাল বলেন, “২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিএডিসির কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তদন্ত চলবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের অভিযান চলমান থাকবে।” স্থানীয়রা দাবি করছেন, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকল্পের অবশিষ্ট ৫৬ কোটি টাকার কার্যক্রম স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করার দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন তারা।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযান:
কুষ্টিয়া শহরের কালীশংকরপুরে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কার্যালয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালায়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন কুষ্টিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নীলকমল পাল। অভিযানকালে দেখা যায়, চার বছরের কাজের অগ্রগতি কাগজে-কলমে ৭৫ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা কার্যত সম্পন্ন হয়নি। ২৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পে ইতোমধ্যেই ১৯২ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে সেই ব্যয় প্রতিফলিত হয়নি।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযোগের ভিত্তিতে সুপারিশ করেছে, প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ নয়-ছয় এবং কাজের অস্তিত্বহীনতার কারণে তদন্ত চালানো হোক। অভিযান শেষে নীলকমল পাল সাংবাদিকদের বলেন, “২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মুজিবনগর সেচ প্রকল্পে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিএডিসির কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। আমরা মাঠপর্যায়েও তদন্ত করব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের অভিযান চলমান থাকবে।”

