দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যের উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। ব্যয়বহুল চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর ধুলো জমে আছে, জনবল সংকটের কারণে সেগুলো ব্যবহার করা যায় না। ফলে রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদাহরণ বিশেষভাবে চিত্তাকর্ষক। সদর উপজেলার গৃহবধূ তাছলিমা বেগম বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রাথমিক ইসিজি পরীক্ষা করা হলেও, ইকো, এনজিওগ্রাম বা সিটি স্ক্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সেখানে করা সম্ভব হয়নি। কেন? কারণ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ক্যাথ ল্যাব যা ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় তৈরি, বছর ধরে বন্ধ। ইকো-ইটিটি ও ইসিজি মেশিনও ব্যবহারযোগ্য নয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, এই পরীক্ষা ছাড়া রোগীর ধমনীতে ব্লক আছে কি না তা নিশ্চিত করা যায় না। শেষপর্যন্ত পরিবারকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিকে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় এনজিওগ্রাম না হওয়ায় তাছলিমাকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঠাতে হয়েছে। তাছলিমা বলেন, “হাসপাতালে যন্ত্র আছে, কিন্তু চালানোর মানুষ নেই। গরিব মানুষের চিকিৎসা করা যায় না।”
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে প্রায় ৫৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাথ ল্যাব, এমআরআই মেশিন, ডিজিটাল এক্স-রে, রেডিওথেরাপি মেশিন এবং নষ্ট ইকো-ইটিটি। জনবল ও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে এসব যন্ত্র ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সারসহ গুরুতর রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের অবস্থা আরও শোচনীয়। তিন বছর আগে ১৫০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলেও জনবল না থাকার কারণে এগুলো এখনও ব্যবহারযোগ্য নয়। এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম—সবই ঝুলে আছে। হাসপাতাল চালু হলেও জরুরি বিভাগগুলো এখনও কার্যকর হয়নি।
স্বাস্থ্যখাতের এই ব্যর্থতা শুধু জনবল সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দরপত্রে প্রতিযোগিতার অভাব এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও সমস্যা তৈরি করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪৩ শতাংশ চুক্তি একক দরদাতার হাতে। আর পাঁচটি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে ৮৩ শতাংশ চুক্তির মূল্য। এ কারণে বাজারে দামের উত্থান ও সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যায় সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোতে। প্রক্রিয়াগত কাঠামো থাকলেও জনবল সংকট এবং নির্দিষ্ট প্রোকিউরমেন্ট সেলের অভাবে ক্রয় প্রক্রিয়া ধীর। স্বাস্থ্য খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে একই সমস্যা—নিয়ন্ত্রণের অভাব, দুর্বল তদারকি এবং বাজেটের সঙ্গে অসামঞ্জস্য।
পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “প্রতিবেদনগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।”
দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ব্যবহারযোগ্য হবে না, আর সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হতে থাকবে। সরকারের উচিত এই সংকটের দ্রুত সমাধান করা।

