পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এসব অনিয়ম নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। প্রকল্পের অধীনে ৯টি প্যাকেজে প্রায় ১০৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে সব প্যাকেজের কার্যাদেশই দেওয়া হয় বহুল আলোচিত ও চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ আওয়ামী ঠিকাদার বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজকে। প্রায় দেড় বছর আগে বিল পরিশোধ করা হলেও এখনো প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ মালামাল বুঝে পায়নি। প্রতিষ্ঠানটি নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে তাতে ইউরোপ ও আমেরিকার নামের স্টিকার ও সিল ব্যবহার করেছে বলেও জানা গেছে।
এ অবস্থায় একই ঠিকাদারকে আবারও ৭৬ কোটি টাকার নতুন কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। টেন্ডারের শুরু থেকেই গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পিপিআর-এর গুরুত্বপূর্ণ ধারা এখানে সরাসরি লঙ্ঘন করা হয়েছে। এই অনিয়ম ঘিরে একাধিক প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে। দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নিতে উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং সচিব মো. সাইদুর রহমান লিখিত নির্দেশ দিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নির্দেশনার পরেও দুর্নীতিবাজ চক্রের তৎপরতা থামছে না।
সাম্প্রতিক টেন্ডারে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য ৭০৩টি চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মালামাল ক্রয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এসব সরঞ্জামের মোট মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৭৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। ক্রয় তালিকায় বিভিন্ন শ্রেণির পণ্য একত্রে রাখা হয়েছে, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালার পরিপন্থি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ অনৈতিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পিপিআর-এর বাধ্যতামূলক শর্ত হলো, প্রতিটি বিভাগ বা ক্যাটাগরির জন্য আলাদা লটে টেন্ডার আহ্বান করা।
সূত্রগুলো বলছে, আগের টেন্ডারের মতো এবারও ঠিকাদার বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজকে কার্যাদেশ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এভাবে প্রক্রিয়া সাজানো হয়েছে। টেন্ডারের স্পেসিফিকেশনও সেই অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্পেসিফিকেশনগুলো দুর্বল এবং এতে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও মডেলের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা পিপিআর বিধিমালা লঙ্ঘন করে। ওয়ারেন্টি মেয়াদও কম চাওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে আগের টেন্ডারে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। তখন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছিলেন। কেনাকাটার সব সিদ্ধান্ত গিয়েছিল তাঁর মাধ্যমে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কার্যক্রমের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তাঁর স্বামী ডা. মশিউর রহমান, যিনি পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন)। তিনি ঠিকাদার বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজের সঙ্গে গোপন সমঝোতা ও ভাগবাটোয়ারার কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, এবারকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এই চিকিৎসক দম্পতির প্রভাব স্পষ্ট। ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন এখনও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক পদে আছেন, তাঁর স্বামীও আগের পদেই কর্মরত। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন ডা. এস এম কবির হাসান, যিনি আগে পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ছিলেন। তবে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে তত্ত্বাবধায়ক দম্পতির প্রভাব ব্যাপক থাকায় প্রকল্প পরিচালকও কার্যত তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
টেন্ডার–সংক্রান্ত সব আলোচনা তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে বসে হচ্ছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। তাদের মতে, আগের সময়ের তুলনায় এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দুর্নীতিপ্রবণ চক্র। টেন্ডার প্রক্রিয়ার শুরুতেই ভয়াবহ অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দৃষ্টিগোচর করতে গত ২ নভেম্বর একটি অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রটি দিয়েছেন একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী মো. এনামুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগে বলা হয়েছে, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সংগ্রহের জন্য ২৭ অক্টোবর দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্রে ৭০৩টি ভিন্ন পণ্যের সমন্বয়ে একটি একক প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। প্যাকেজটিতে ছুরি-কাঁচি, ঘড়ি, টেলিভিশন, এক্স-রে যন্ত্র, অ্যানেসথেশিয়া যন্ত্রসহ বিভিন্ন বিভাগের সরঞ্জাম রাখা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, প্যাকেজটির কারিগরি নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে নিম্নমানের স্পেসিফিকেশন দিয়ে। যদিও কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এফডিএ বা সিই সনদ চাওয়া হয়েছে, তবু একাধিক আইটেমে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও মডেলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যা পিপিআর-২০২৫-এর পরিপন্থি। এছাড়া পাঁচ বছরের পরিবর্তে মাত্র দুই বছরের ওয়ারেন্টি চাওয়া হয়েছে। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের পরিবর্তে স্থানীয় যে কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে, যা মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি সরবরাহে বাধা তৈরি করবে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ আছে, এর আগে একই ধরনের একাধিক ক্রয়ে নিম্নমানের যন্ত্রে ইউরোপ ও আমেরিকার নামি ব্র্যান্ডের স্টিকার ও সিল ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই মালামাল গ্রহণে অনীহা দেখায়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ৭০৩টি আইটেম সরবরাহে দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান এককভাবে দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। ফলে দরপত্রটি প্রতিযোগিতাহীন ও একচেটিয়া হয়ে যাবে এবং সরকারি অর্থের বড় ধরনের অপচয় ঘটতে পারে। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতেই এ ধরনের প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সব নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ‘বাংলাদেশ সায়েন্স হাউস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০৫ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেয়।
অভিযোগপত্রে প্রস্তাব করা হয়েছে, প্যাকেজটিকে পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিভাগ ও ব্যবহারের ভিত্তিতে বিভিন্ন লটে ভাগ করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করতে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং অপচয় কমবে বলেও উল্লেখ করা হয়। অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, উপদেষ্টার একান্ত সচিব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাফর এবং সিপিটিইউর মহাপরিচালকের কাছে।
জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি তদন্তের জন্য স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ৫ নভেম্বর সচিবের কাছে পাঠান। এরপর সচিব মো. সাইদুর রহমান ওই দিনই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা)কে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, উপদেষ্টা ও সচিবের সেই নির্দেশ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

