দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ, আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখভালের জন্য গঠিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)—এই সংস্থার নাম শুনলে সাধারণ মানুষের মনে ভরসা জন্মানোর কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি ধরার দায়িত্ব যাদের, সেই কর্মকর্তাদেরই ঘিরে এখন তৈরি হয়েছে ঘুষের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের নামেই চলছে এই ঘুষ আদায়। বহুল পরিচিত এই ‘মিনিস্ট্রি অডিট’-এ একজন শিক্ষক বা কর্মচারীর এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ টাকা ঘুষ হিসেবে নেন ডিআইএ কর্মকর্তারা। কোথাও কোথাও সেই রেট পৌঁছে গেছে দুই মাসের বেতনেও।
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ডিআইএতে বদলানো হয় তিনজন পরিচালক। আশা ছিল, দুর্নীতির ধরন বদলাবে, স্বচ্ছতা বাড়বে। কিন্তু অভিযোগ বলছে, পরিবর্তন হয়নি কিছুই; বরং কয়েক জায়গায় ঘুষের পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে।
ঘুষ রোধে সাবেক পরিচালক সাইফুল ইসলাম নানা কৌশল নিয়েছিলেন—গোয়েন্দা সংস্থা, মসজিদের ইমাম, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যুক্ত করে নজরদারি চালান। কিন্তু ‘অডিটের নামে ঘুষ-বাণিজ্য’ থামেনি। নতুন পরিচালক শহিদুল ইসলামও একইভাবে নজরদারি করছেন, কিন্তু ফলাফল একই—অভিযোগ থামছে না।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টানা ২০টি অডিট টিমের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের পর প্রতিটি টিমের বিরুদ্ধেই ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে পটুয়াখালীর বাউফলের নওমালা ফাজিল মাদ্রাসায়। সেখানে অডিটে যান পরিদর্শক ড. দিদারুল জামান ও অডিটর সিরাজুল ইসলাম। প্রথমে তারা আশ্বস্ত করেছিলেন—অডিটের জন্য কোনো টাকা লাগবে না। কিন্তু ঢাকায় ফিরে অবস্থান পাল্টে যায়।
সিরাজুল ইসলাম মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে ফোন করে ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারীর এক মাসের বেতন—সাড়ে সাত লাখ টাকা—ঘুষ হিসেবে দাবি করেন। এতে রাজি না হলে অডিট রিপোর্ট নাকি ‘বিপদের কারণ’ হয়ে দাঁড়াবে।
চাপে পড়ে অধ্যক্ষ প্রথম দফায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেন—এর একটি অডিওও আছে। অডিওতে শোনা যায়, যাদের থেকে টাকা উঠবে তাদের ফাইল জমা হবে, যারা দেবে না তাদের ফাইল আটকে থাকবে।
এদিকে এনটিআরসিএ–এর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া সাতজন শিক্ষক ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সমস্যা আরও জটিল হয় এবং বিষয়টি স্থানীয় নেতাদের কাছে পৌঁছায়।
অধ্যক্ষের কাছে টাকা তোলার অডিও থাকার পরও তিনি দাবি করেন—ঘুষের টাকা আদায় করেননি।
দুইজন শিক্ষক অবশ্য জানিয়েছিলেন—অর্থ দেওয়ার পরেও এখন সবাই অস্বীকার করছেন, কারণ ডিআইএ কর্মকর্তারা হুমকি দিয়েছেন—ঘুষের কথা স্বীকার করলে রিপোর্ট ‘খারাপ’ করে দেওয়া হবে।
অন্যদিকে দিদারুল জামান ও সিরাজুল ইসলাম দুজনই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গত জুনে আরেক অভিযোগ উঠে আসে গোপালগঞ্জে। সেখানে অডিট করতে গিয়েছিলেন সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক ফজিলাতুন্নেসা ও সুলতান আহমদ। শুরুতে ঘুষ লাগবে না—এমন কথা বললেও ঢাকায় ফিরে সুলতান আহমদ বরইহাটি আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের সাত শিক্ষকের কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা নেন বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের ছেলে অলিউর শেখ এই অভিযোগ ডিআইএ পরিচালকের কাছে জমা দেন, সঙ্গে দেন অডিও রেকর্ডও।সুলতান অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেন।
১৮ জুন চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ অঞ্চলে ৯টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ নাকি সমস্ত শিক্ষক-কর্মচারীর এক মাসের বেতন ঘুষ হিসেবে তুলে এনেছেন। ডিআইএর ভেতরে তিনি পরিচিত ‘ঘুষের রাজা’ নামে।
ডিআইএ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। সারা দেশের ৩৭ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণে এখানে মোট কর্মকর্তা আছেন ৩০ জন। তাদের সঙ্গে যুক্ত অডিট দপ্তরের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও অডিটর।
অভিযোগ বলছে, ক্যাডার ও অডিট বিভাগের মোট ১৬ জন কর্মকর্তা মিলে গড়ে তুলেছেন ঘুষের শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
অভিযুক্তদের মধ্যে আছেন—
দিদারুল জামান, আবু দাউস, মকবলার রহমান, কাওসার হোসেন, আবুল কালাম আজাদ, সাইফুর রহমান সুমন, ড. সোহেল রানা, আজিম কবীর, ফিরোজ হোসেন, সুলতান আহমদসহ আরও কয়েকজন অডিটর।
তারা সবাই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন—৫ আগস্টের পর নাকি ঘুষ-বাণিজ্য বন্ধ হয়েছে।
২০১৭ সালে ঘুষসহ গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি বদলে দেয় এসব কর্মকর্তার কাজের ধরন। এখন তারা অডিটে গিয়ে প্রথমে প্রতিষ্ঠানের নানা ত্রুটি দেখিয়ে ভয় দেখান, তারপর আলাদা গোপন জায়গায় ঘুষের রেট ঠিক করেন। টাকা নেওয়া হয় ঢাকার বাইরে বা নির্দিষ্ট অজ্ঞাত জায়গায় তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে।
উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে চট্টগ্রামের একটি ঘটনা—১০টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০০ শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা পেয়েছেন বলে অভিযোগ আছে পরিদর্শক আজাদের বিরুদ্ধে। তিন দফায় সাভারের কাছ থেকে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে সেই টাকা উঠানো হয়।
এ ধরনের অনিয়মের খবর আগেও প্রকাশিত হয়েছে। দুদক অভিযানও চালিয়েছে। যেমন—২০২২ সালে মনিরামপুরে ১০টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে এক পরিদর্শক অর্ধকোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে বদলি হয়েছিলেন।
কিন্তু অভিযোগ বলছে—স্থান বদলায়, মানুষ বদলায়, রেওয়াজ বদলায় না।

