২৭৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। নির্ধারিত ছিল দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে কিন্তু বাস্তবে সেই কাজ শেষ হতে সময় লেগেছে পুরো ১১ বছর। দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয়ও হু-হু করে বেড়েছে। শুরুতে ২৭৫ কোটি টাকা ধরা হলেও পরে তা দাঁড়িয়েছে ৬৮২ কোটি টাকায়। সময় ও ব্যয়ের এই বিপুল বৃদ্ধি প্রকল্পজুড়ে লুকিয়ে থাকা নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির দিকেই ইঙ্গিত দেয়।
নথিতে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব দুর্নীতি। অনেক কাজ না করেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যবহৃত হয়েছে নিম্নমানের সামগ্রী। ডিপিপি বহির্ভূত কাজ যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি একই তলার নির্মাণে দুই দফা চুক্তির মতো অস্বাভাবিক ঘটনাও ঘটেছে। এসব অনিয়ম শুধু প্রকল্প ব্যয় বাড়ায়নি বরং পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই সব অনিয়ম ও দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। কিন্তু সরকারি তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযুক্ত করা হয়েছে মাত্র দুই প্রকৌশলীকে। তাঁরা প্রকল্পের তুলনামূলক কম সময় দায়িত্বে ছিলেন এবং দায়িত্বেও ছিলেন নিচের সারিতে।
প্রকল্পের বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেছেন একাধিক প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী। কিন্তু তদন্তে তাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যেসব ব্যক্তি এ কাজে জড়িত ছিলেন তাঁরাও আড়ালেই রয়ে গেছেন সরকারি প্রতিবেদনে। পুরো প্রকল্প ঘিরে এই দায় এড়ানো, অনিয়ম আড়াল করা এবং প্রকৃত দায়ীদের বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—১১ বছরের বিলম্ব আর তিনগুণ ব্যয়বৃদ্ধির দায় আসলে কার?
নথিপত্রে দেখা গেছে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ২৭৫ কোটি টাকা কিন্তু নানা অজুহাত, অনুমোদনবহির্ভূত কাজ, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এই ব্যয় এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮২ কোটি টাকায়। বাড়তি ৪০৭ কোটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে মেডিকেল যন্ত্রপাতি, হাসপাতাল ভবন নির্মাণ, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজ, সীমানা প্রাচীর–ভূমি উন্নয়ন এবং নতুন সংযোজিত বিভিন্ন খাতে।
মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনায় বাড়তি ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০১ কোটি টাকা। হাসপাতাল ভবন নির্মাণে অতিরিক্ত দেখানো হয়েছে ১০০ কোটি। ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল খাতে খরচ বাড়ানো হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। সীমানা প্রাচীর ও ভূমি উন্নয়নে যোগ হয়েছে আরও ৪০ কোটি। আর ‘বিভিন্ন নতুন অংশে’ দেখানো হয়েছে অতিরিক্ত ৬৩ কোটি টাকা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ নির্মাণে অনিয়মের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. শহীদুল্লাহ খন্দকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রকৌশলী। ফলে ভয়াবহ অনিয়মের পরও প্রকৃত হোতাদের বাদ দিয়ে ভিন্নমতাবলম্বী প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এমনকি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যেসব কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক এই কাজে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যারা অনিয়ম করে ইতিমধ্যে অবসরে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ হয়নি।
নথি বলছে, শুধু হাসপাতাল ভবন নির্মাণকাজেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। অনুমোদিত ডিপিপিতে ১১২ কোটি টাকার বাজেট থাকলেও যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে ২০০৮ সালের রেট শিডিউলের পরিবর্তে ২০১৪ সালের রেট শিডিউল ব্যবহার করা হয়। সে সময় ৭ তলা নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তা কমিয়ে ৩ তলা করে দরপত্র আহ্বান ও চুক্তি সম্পন্ন করা হয়।
হাসপাতাল ভবন নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের দরপত্র (৩ তলা পর্যন্ত) ছিল অতিমাত্রায় ‘ফ্রন্ট লোডেড’। যেখানে ঠিকাদারের দর বেশি ছিল—যেমন আরসিসি, বালু ভরাট, এমএস রড—সেসব আইটেমে অনুমোদন ছাড়াই কাজের পরিমাণ বাড়ানো হয় এবং অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়। আবার কম দরের কাজ—রং, টাইলস, ফ্যান, সুইচ—ইচ্ছাকৃতভাবে কমানো বা বাদ দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল ভবনের দ্বিতীয় পর্যায়ে (৪র্থ থেকে ৭ম তলা) দরপত্র ও প্রাক্কলনে প্রথম পর্যায়ের সম্পাদিত কাজ এবং বিভিন্ন আইটেমের অতিরিক্ত পরিমাপ যুক্ত করে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে সেসব হিসাবের ভিত্তিতে ঠিকাদারকে বিলও পরিশোধ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালের এই দ্বিতীয় দরপত্রে প্রভাব খাটিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার জন্য পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান বন্ধ করে দেন পিপিসির তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল ইসলাম। তিনি নিজেই অনিয়ম করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চালান।
এ ছাড়া হাসপাতাল ভবন নির্মাণে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ডিপিপিবহির্ভূত প্রায় ২০ কোটি টাকার ৩০টি ক্ষুদ্র কাজ (প্রতি কাজের মূল্য প্রায় ৪৫–৫০ লাখ টাকা) এলটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব কাজের অনেকটিই বাস্তবে করা হয়নি, তবুও বিল পরিশোধ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
পুরো প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বে ছিলেন উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল কাদের ও আব্দুল্লাহ আল মামুন। নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন শহীদ মো. কবির ও মশিউর রহমান। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন জি এম কামাল পাশা ও এ কে এম গোলাম কবির। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন আবুল বশর। প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ছিলেন মো. শরীয়ত উল্লাহ এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজ আহমেদ।
মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০১ কোটি টাকা। বেশি দরে ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয় এবং পরে পরিমাণ কমিয়ে স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে এসব যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশই অচল বা ব্যবহার উপযোগী নয়। ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি কেনায় অতিরিক্ত খরচ হয়েছে আরও ৩৮.৫০ কোটি টাকা। লিফট, বৈদ্যুতিক সাব–স্টেশন, ফায়ার ফাইটিংসহ বিভিন্ন কাজে ঊর্ধ্বদরে দরপত্র পরিচালনা করে ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়। পরে কাজের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণ বিলও পরিশোধ করা হয়।
সীমানা প্রাচীর ও ভূমি উন্নয়ন কাজে বাড়তি ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩৬.৫০ কোটি টাকা। সংশোধিত ডিপিপিতে যে পরিমাণ কাজের কথা ছিল বাস্তবে তার চেয়ে কম কাজ করেই পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়। দরপত্র আহ্বানেও অনিয়ম হয়েছে এবং ঊর্ধ্বদরে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। ভেরিয়েশন অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে।
একাডেমিক ভবন নির্মাণেও পাওয়া গেছে চরম অসংগতি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে একাডেমিক ভবনের ৬ তলা ভিতের ওপর ৫ তলা পর্যন্ত নির্মাণের চুক্তি আগেই ছিল। সেই কাঠামো থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টরা মিথ্যা তথ্য দেখিয়ে একই ভবনের ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলার কাজের জন্য আবারও একই ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করেন। অর্থাৎ ৫ম তলার জন্য একই ঠিকাদারের সঙ্গে দুইবার চুক্তি করা হয়, যা গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির উদাহরণ।
গণপূর্তের প্রচলিত পদ্ধতি ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে ৬ তলা ভিতের ৫ম তলার কাজের দরপত্র আহ্বান করলে সরকারি অর্থ সাশ্রয় সম্ভব ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অজুহাতে অন্যান্যদের বাদ দিয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নিয়ে শাস্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। অথচ একই ভবনের ৫ম তলার কাজে দুই দফা চুক্তি করে যারা প্রকৃত অনিয়ম করেছেন—তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মাল্টিপারপাস ভবন নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নির্মাণে কোটি টাকার অনিয়ম, ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়াই ডিপিপি প্রণয়ন ও অনুমোদন এবং ডিপিপি সংশোধনে ছয় বছরের দীর্ঘ বিলম্ব—এসব অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশনায় ডিজাইন ও স্কোপ পরিবর্তন করা হলেও জড়িত কর্মকর্তারা থেকেছেন দায়মুক্ত।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিভাগীয় মামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের আবেদনের ভিত্তিতে একাডেমিক ভবন ও স্টাফ নার্স ডরমিটরির অনিয়ম তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তবে তাদের সুপারিশ উপেক্ষা করে ফ্যাসিস্ট আমলে করা তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি গত ২৬ জুন প্রতিবেদন দেয়। সেখানে বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীকে দায়ী করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবন নির্মাণে চুক্তিভঙ্গের মাধ্যমে কাজ সম্পাদনের সময় সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্বে থাকা তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জি এম এম কামাল পাশা, এ কে এম গোলাম কবির, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল কাদের এবং মো. হুমায়ুন কবির চৌধুরী দায় এড়াতে পারেন না।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনুমোদিত ডিপিপির বাইরে ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার বিভিন্ন কাজের ব্যয় প্রাক্কলন ও দরপ্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষেত্রে শহীদ মো. কবির, জি এম কামাল পাশা এবং এ কে এম গোলাম কবির দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়। ডেলিগেশন অব ফিনান্সিয়াল পাওয়ার অনুযায়ী একাডেমিক ভবনের দরপত্র অনুমোদন করার কথা ছিল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু সেটি অনুসরণ না করে শুধু স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
অর্থাৎ অনুমোদন ছাড়া একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এ জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের ক্রয় অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (স্বাস্থ্য উইং) মো. আমান উল্লাহ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পিপিসি) খন্দকার ফওজী বিন ফরিদ, নির্বাহী প্রকৌশলী এ জেড এম তাজুল ইসলাম এবং প্রধান প্রকৌশলী মো. কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে দায়ী করেছে তদন্ত কমিটি।
একাডেমিক ভবনের ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলার নির্মাণেও অনিয়ম পাওয়া গেছে। দাপ্তরিক প্রাক্কলন অনুমোদনের আগেই দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং চুক্তি সম্পাদন করা হয়। এসব কাজে পরিকল্পনা শৃঙ্খলার ব্যত্যয় ও অনিয়মের দায় নির্বাহী প্রকৌশলী এ জেড এম সফিউল হান্নান, শহীদ মো. কবীর এবং খুলনা গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর ওপর বর্তায়। তদন্ত কমিটি বলেছে, প্রকল্পের বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ ছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ডিপিপি প্রণয়ন থেকে মূল্যায়ন, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে—প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ে তারা যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি। কমিটির সুপারিশে বলা হয়, একাডেমিক ভবন (৬ তলা ভিতে ৬ তলা পর্যন্ত) নির্মাণে পাওয়া অনিয়মে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়ী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের মূল ডিপিপি প্রণয়নেও ত্রুটি ছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে ব্যয় প্রাক্কলন ও অন্যান্য দপ্তরিক প্রক্রিয়ায় আরও সতর্ক হওয়ার জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নকালীন মনিটরিং দুর্বল হওয়ায় ভবিষ্যতে মনিটরিং জোরদার করার পরামর্শও দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
নথিপত্র বলছে, প্রকল্পটির বিভিন্ন সময়ে অন্তত পাঁচজন নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্বে ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ছিলেন আরও পাঁচজন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন ছয়জন। একই সময়ে দুইজন প্রধান প্রকৌশলীও দায়িত্ব পালন করেছেন। এসবের বাইরে আলাদা প্রকল্প পরিচালক ছিলেন, আর উপসহকারী প্রকৌশলী পর্যায়েও একাধিক কর্মকর্তা প্রকল্পের কাজে যুক্ত ছিলেন। অদ্ভুতভাবে এই দীর্ঘ তালিকার কাউকেই অভিযুক্ত করা হয়নি। উল্টো অল্প সময় দায়িত্বে থাকা মাত্র দুইজন প্রকৌশলীকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্প পরিচালনায় ছিলেন এমন বহু প্রভাবশালী কর্মকর্তা, যাদের সরাসরি সমর্থন ছাড়া ব্যয় তিনগুণ বৃদ্ধি, কেনাকাটায় অনিয়ম ও নির্মাণে এ ধরনের ব্যাপক দুর্নীতি অসম্ভব। কিন্তু শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় সেই প্রভাবশালীদের নাম নেই; তারা পুরোপুরি ‘অদৃশ্য’।
অভিযোগ আছে—যে কাজের দায়ে দুইজন প্রকৌশলীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেই একই কাজে জড়িত ছিলেন অন্তত আরও ছয়জন কর্মকর্তা। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই প্রকল্পে অনিয়মের প্রকৃত অপরাধীরা কারা, আর শাস্তি পাচ্ছেন কারা?
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব ছিল তদন্ত করা। আমরা তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করেছি। এরপর মন্ত্রণালয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছি। কী ব্যবস্থা হবে বা কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে, তা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন বা আইন শাখাই ঠিক করবে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।’

