বিডি জবসের মাধ্যমে সরকারি চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রতারক চক্র। জনপ্রিয় এই চাকরি প্ল্যাটফর্মের গ্রহণযোগ্যতা কাজে লাগিয়ে ইতিমধ্যেই কয়েকজন প্রার্থী প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, বিডি জবসের অবহেলার কারণে প্রতারকরা ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রকাশের সুযোগ পেয়ে গেছে। বিডি জবস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, নিয়োগদাতাদের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করার জন্য তাদের কাছে সব ধরনের টুলস নেই। এই সুযোগে প্রতারণাকারীরা বিডি জবসের মাধ্যমে ভুয়া বিজ্ঞাপন ছড়াচ্ছে। ইতিমধ্যেই অনেক চাকরিপ্রার্থী এই ফাঁদে পড়েছেন। তদন্তে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী ও পেশাজীবীরা বিডি জবসকে একটি নির্ভরযোগ্য চাকরির সন্ধানদাতা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছেন। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও নিয়োগের জন্য এই ওয়েবসাইট ব্যবহার করে। প্রতিদিন হাজারো ব্যবহারকারী নতুন চাকরির খোঁজে এই সাইট ঘাঁটেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয় একটি মেইল অ্যাড্রেস: chcpproject@gmail.com। বিজ্ঞাপনে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হলেও, এটি বাস্তব বা নিবন্ধিত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আবেদন করার পর প্রার্থীদের ইমেইলে উত্তর আসে। সেখানে প্রাথমিক তথ্য চাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ‘রেজিস্ট্রেশন ফি’ বা ‘প্রসেসিং চার্জ’ হিসেবে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী এক চাকরি প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিজ্ঞাপনটি একটি স্বনামধন্য প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হওয়ায় সন্দেহ করার সুযোগই ছিল না। চাকরি পাওয়ার আশায় আমি নির্দিষ্ট ফি পাঠাই। মোবাইল ব্যাংকিং ও অন্যান্য পেমেন্ট মাধ্যমে টাকা পাঠানোর পর নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের ইমেইল থেকে প্রাথমিক আশ্বাসমূলক বার্তা পাই। কিছু সময় পর সেই যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ইমেইলের কোনো উত্তর আসে না, প্রচারিত নম্বর বা ঠিকানায় যোগাযোগ সম্ভব হয় না এবং অবশেষে বুঝতে পারি, আমি ভুয়া বিজ্ঞাপনের ফাঁদে প্রতারণার শিকার হয়েছি।”
অপর এক প্রতারিত প্রার্থী আশরাফুল সাদমান বলেন, “কয়েক সপ্তাহ আগে আমি বিডি জবসের ওয়েবসাইটে ‘কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রজেক্ট নামে একটি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখি। বিজ্ঞাপনটিতে জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবামূলক কাজে নিয়োগ, ভালো বেতন, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। একজন মেডিকেল ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থী হিসেবে এবং মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার মানসিকতা থেকে আমি আবেদন করি।
প্রথমে আমাকে বলা হয়, রেজিস্ট্রেশন বা ভেরিফিকেশন ফি হিসেবে ৭৪৫ টাকা একটি বিকাশ নম্বরে পাঠাতে হবে। চাকরির প্রত্যাশায় আমি টাকা পাঠাই। এর কিছু সময় পর আমাকে একটি ফর্ম পাঠানো হয়। সেখানে ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সম্ভাব্য কর্মস্থল ও অন্যান্য তথ্য পূরণ করতে বলা হয়। ফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল সুযোগ-সুবিধা ও শর্তাবলির একটি ডকুমেন্ট। এতে বলা হয়, প্রার্থীকে একটি ট্রেনিং কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে এবং ৩ হাজার ৭৫০ টাকা ফি দিতে হবে, তবে প্রশিক্ষণ শেষে অর্থ ফেরত দেয়া হবে। এই আশ্বাসের ভিত্তিতে আমি আবারও যোগাযোগ রাখি। এরপর একই বিকাশ নম্বর দিয়ে বলা হয়, ৩ হাজার ৮৩০ টাকা পাঠাতে হবে। চাকরির প্রত্যাশায় আমি সেই টাকা পাঠাই। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, আমি ভুয়া বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে প্রতারণার শিকার হয়েছি।”
এক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একদিন না যেতেই আমাকে ফোন করা হয় এবং আরও বড় প্রলোভন দেখানো হয়। বলা হয়, নির্বাচিত প্রার্থীদের জন্য মোটরসাইকেল ও ল্যাপটপ দেওয়া হবে, যাতে তারা দায়িত্ব আরও দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারে। তবে সুবিধা পেতে আরও ১২ হাজার টাকা দিতে হবে এবং এক ঘণ্টার মধ্যে পাঠাতে হবে। কারণ পণ্যগুলো সঙ্গে সঙ্গে অর্ডার করা হবে।
এই অস্বাভাবিক সুবিধা ও দ্রুত অর্থ পাঠানোর চাপ শুনে আমার সন্দেহ হয়। আমি তখন যাচাই করার উদ্যোগ নেই। সরাসরি নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিকের মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের রেজিস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখানে জানতে পারি, ‘(CHCP Project)’-এর নামে এমন কোনো নিয়োগ কার্যক্রম বর্তমানে নেই এবং তাদের পক্ষ থেকে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি।”
আশরাফুল সাদমান বলেন, “ওই কর্মকর্তা জানান, এরকম ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপনের বিষয়ে এর আগে একাধিকবার সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে এবং জনগণকে সতর্ক করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আমি তাদের ওয়েবসাইট বা অফিসিয়াল মাধ্যমে কোনো সতর্কবার্তা খুঁজে পাইনি। সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেলে আমি বিডি জবস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং পুরো ঘটনা জানাই। তাদের এক প্রতিনিধি জানান, বিষয়টি জানার পর তারা সংশ্লিষ্ট ভুয়া প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকে তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্লক করেছে।”
প্রতারিত ওই চাকরিপ্রার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুধু ব্লক করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাকে বিডি জবসের মেইলে একটি অভিযোগ পাঠাতে বলা হয়। আমি বিকাশ কর্তৃপক্ষের কাছেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছি। আমার অভিযোগ নম্বর ৩০৪৩০১৯২। বিকাশ আমাকে আশ্বস্ত করেছে, ছয় কর্মদিবসের মধ্যে তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। তবে এখনও টাকা ফেরতের কোনো নিশ্চিত নিশ্চয়তা পাইনি।”
বিডি জবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেছেন, “আমি এ বিষয়ে অবগত নই। আমাদের প্রতিষ্ঠানে যদি কোনো বিজ্ঞপ্তি নিয়ে অভিযোগ আসে, আমরা তা খতিয়ে দেখি। ভুয়া বিজ্ঞাপন দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্লক করে দিই। আমাদের প্ল্যাটফর্ম আসলে ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো। কিন্তু আমাদের আরও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি অফলাইনে ভেরিফাই করা সম্ভব নয়। তাই অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনের মাধ্যমে যাচাই করি। এই বিষয়টি নিয়ে আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকব।”
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে অনলাইন জব পোর্টালগুলোর জন্য শক্তিশালী নীতিমালা ও পর্যবেক্ষণ কাঠামো থাকা জরুরি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বৈধ কাগজপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন নম্বর বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে যাচাই করা, সন্দেহজনক বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রতারণা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

